ধর্ষণের শিকার কিশোরীর ছবি ফেসবুকে দিলেন ওসি মনির!
ধর্ষণের শিকার কিশোরীর ছবি ফেসবুকে দিলেন ওসি

কক্সবাজারের চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনির হোসেনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের শিকার এক কিশোরীর ছবি তুলে থানার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশের অভিযোগ উঠেছে। গত সোমবার রাতে ভিকটিমের ছবি পোস্ট করার পর মুহূর্তেই তা ভাইরাল হয়ে যায়।

ঘটনার প্রেক্ষাপট

সম্প্রতি এক ব্যক্তিকে পেটানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় চকরিয়া থানার এসআই মোহাম্মদ আরকানুল ইসলামকে প্রত্যাহার করা হয়। ওই ঘটনার নেপথ্য নির্দেশদাতা হিসেবে ওসির অপসারণ ও শাস্তির দাবি থেকে জনদৃষ্টি সরাতেই মনির হোসেন এমন অপকৌশলের আশ্রয় নেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ।

ধর্ষণের ঘটনা

জানা গেছে, ঈদগাঁও উপজেলার এক কিশোরীর সঙ্গে ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ছাইরাখালী এলাকার নুরুল আমিনের (২৪) প্রেমের সম্পর্ক ছিল। ওই সম্পর্কের সূত্র ধরে কিশোরী নুরুল আমিনের বাড়িতে চলে আসে বলে দাবি ছেলের পরিবারের। তবে কিশোরীর বাবা অভিযোগ করেন, ২৮ মে তার মেয়েকে অপহরণ করা হয়েছে এবং তিনি থানায় মামলা করেন। ৩০ মে পুলিশ অভিযান চালিয়ে কিশোরীকে উদ্ধার করে এবং নুরুল আমিনকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। এ ঘটনায় কিশোরীকে নিজ বাড়িতে দুই দিন আটকে রেখে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছে। সদর হাসপাতালে পরীক্ষায় ধর্ষণের সত্যতা মিলেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ওসির বিতর্কিত পদক্ষেপ

এর আগে অভিযুক্ত নুরুল আমিনকে মারধরের ঘটনার একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনার মুখে এসআই মোহাম্মদ আরকানুল ইসলামকে প্রত্যাহার করে জেলা পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়। আলোচিত এ ঘটনার মোড় ঘুরাতেই ওসি ভিকটিমের ছবি থানার ফেসবুক পেজে প্রকাশ করেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অভিযোগ রয়েছে, চকরিয়া থানা পুলিশের অভিযানে ভিকটিম কিশোরীকে উদ্ধার করে থানায় নেওয়া হয়। সেখানে নিজের রুমে কিশোরীর বুকের ওড়না সরিয়ে তার ছবি তোলেন মনির হোসেন নিজেই। সোমবার রাতে থানার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে ছবিটি প্রকাশ করা হয়। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে পেজটি ডিঅ্যাক্টিভেট করে দেওয়া হয়। প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, কিশোরীর ওড়নাটি সরিয়ে রাখা হয়েছে ওসির রুমের আসবাবপত্রের ওপর। কেবল ছবি প্রকাশ করেই ক্ষান্ত হননি ওসি; আসামি নুরুল আমিনকে মারধরের সমালোচনাকারীদের জবাব দিতে কিশোরীর ছবির সঙ্গে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাসও জুড়ে দেন তিনি।

আইন লঙ্ঘন ও প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, নির্যাতিত কোনো শিশু বা নারীর ছবি ও পরিচয় কোনোভাবেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পত্রিকা বা টেলিভিশনে প্রকাশ করা যাবে না। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১৪ ধারা অনুযায়ী, অপরাধের শিকার হওয়া নারী বা শিশুর পরিচয় এমনভাবে প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, যা তাকে সমাজে চিহ্নিত করে। এ আইন অমান্য করলে সর্বোচ্চ ২ বছরের জেল এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

ভিকটিমের বাবা যুগান্তরকে বলেন, 'আমার মেয়েকে পুলিশ উদ্ধারের পর কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানকার চিকিৎসকরা ধর্ষণের আলামত পেয়েছেন বলে ওসি স্যার আমাকে জানিয়েছেন। তবে ফেসবুকে আমার মেয়ের ছবি প্রচারের বিষয়ে ওসি স্যার আমাকে কিছুই জানাননি, আমার কোনো অনুমতিও নেননি।'

কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবদুল মান্নান বলেন, 'নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১৪ ধারা অত্যন্ত স্পষ্ট। আইনের রক্ষক হিসেবে ওসির এ আচরণ সরাসরি আইন লঙ্ঘন। তার বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে কঠোর আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।'

হুমকি ও প্রশাসনের বক্তব্য

স্থানীয় সংবাদকর্মীদের অভিযোগ, ওসির এ বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কেউ সোচ্চার হলে বা সংবাদ প্রকাশ করলে সাংবাদিকদের 'ডাকাতি ও ইয়াবা মামলায় ফাঁসানোর' হুমকি দিয়ে মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করছেন তিনি। কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. অহিদুর রহমান বলেন, 'ভিকটিমের কোনো ছবি বা পরিচয় প্রচার করা আইন পরিপন্থি। থানার ফেসবুক পেজে ভিকটিমের ছবি দিয়ে ঠিক করেননি ওসি। আমি তার সঙ্গে কথা বলব।'

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী বলেন, 'ভিকটিমের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষা করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব। সেখানে উল্টো তার পরিচয় বা ছবি প্রকাশ করা ভিকটিমের প্রতি দ্বিতীয় দফা অবিচার। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ওসিকে অবিলম্বে অপসারণ করে বিভাগীয় তদন্ত ও আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।'

চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, 'বিষয়টি আমি আপনার মাধ্যমেই প্রথম জানলাম। আমি দ্রুত জেলা পুলিশ সুপারের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।'