ভারতের কেরালা রাজ্যে দেড় বছর বয়সি এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় ভয়াবহ নির্যাতন ও হত্যার তথ্য উঠে এসেছে। প্রথমে দাবি করা হয়েছিল, খাবার গলায় আটকে শ্বাসরোধ হয়ে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তে প্রকাশ পায়, দীর্ঘদিনের শারীরিক নির্যাতনের ফলে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে।
শিশুটির পরিচয় ও ঘটনাস্থল
নিহত শিশুর নাম আরশিদ। কেরালার রাজধানী তিরুবনন্তপুরম থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের নেদুমাঙ্গাডের পানাভুর এলাকায় ঘটনাটি ঘটে। গত ২৯ মে সন্ধ্যায় আরশিদকে প্রথমে পানাভুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তাকে শ্রী অবিট্টম থিরুনাল (এসএটি) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মিথ্যা গল্প ও ময়নাতদন্তের সত্য
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে শিশুটির সৎবাবা আশকার জানান, খাবার গলায় আটকে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল আরশিদ। তবে শিশুটির স্বজনরা এ দাবি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে পুলিশকে অবহিত করেন। পরে ময়নাতদন্তে দেখা যায়, শিশুটির সারা শরীরে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তদন্তকারীরা তার শরীরে মোট ৫১টি ক্ষত শনাক্ত করেন। এর মধ্যে যৌনাঙ্গে গভীর আঘাত এবং দুই পায়ে সিগারেটের ছ্যাঁকার দাগও ছিল।
গ্রেফতার ও হত্যার পরিকল্পনার স্বীকারোক্তি
ঘটনার পর ৩০ মে রাতে পুলিশ আরশিদের ২১ বছর বয়সি মা আখিলা এবং তার সঙ্গে বসবাসকারী প্রেমিক আশকারকে গ্রেফতার করে। পরে তাদের আদালতে হাজির করা হলে বিচারিক হেফাজতে পাঠানো হয়। সোমবার প্রমাণ সংগ্রহ ও ঘটনার পুনর্গঠনের জন্য আশকারকে বাড়িতে নিয়ে যায় পুলিশ। সেখানে শিশুটিকে মারধরের জন্য ব্যবহৃত একটি লাঠি এবং সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত একটি লাইটার উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পুনর্গঠনের পর আশকার পুলিশকে জানান, তিন মাস আগেই তিনি আরশিদকে হত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। গত এক মাস ধরে নিয়মিতভাবে শিশুটির ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বলেন, আখিলার সঙ্গে তার সম্পর্কের পথে বাধা হিসেবে আরশিদকে দেখতেন তিনি।
হত্যার দিনের বিবরণ
পুলিশের তথ্যমতে, ২৯ মে শিশুটি জোরে কান্নাকাটি করলে আশকার তার মাথায় আঘাত করেন। পরে শিশুটি মারা গেছে নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি ঘর পরিষ্কার করেন এবং আলামত নষ্ট করার চেষ্টা করেন। এরপর শিশুটিকে হাসপাতালে নিয়ে যান। তদন্তে আরও জানা যায়, মৃত্যুর আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে শিশুটির কান্নার শব্দ বন্ধ করতে তার মুখে কাপড় গুঁজে দেওয়া হতো। নির্যাতনের কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন বস্তু একটি খালে ফেলে দেওয়ার কথাও স্বীকার করেছেন আশকার।
এক মাস আগেই ভেঙে দেওয়া হয়েছিল দুই হাত
হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক মাস আগে আরশিদের দুই হাত ভেঙে যায়। এ বিষয়ে প্রতিবেশীরা জানতে চাইলে আশকার দাবি করেছিলেন, সাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে শিশুটির হাত ভেঙেছে। পরে আখিলা আহত শিশুর একটি ছবি নিজের হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাসে পোস্ট করেন। গত ১৬ মে, মৃত্যুর প্রায় দুই সপ্তাহ আগে আরশিদকে নিয়ে তার মা একটি বাসস্ট্যান্ডে এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কনটেন্ট নির্মাতার সঙ্গে দেখা করেন। ওই নির্মাতা ইনস্টাগ্রাম অনুসরণ করার জন্য তাদের কিছু উপহার দিয়েছিলেন। সেই সময় তোলা ছবিতে দেখা যায়, শিশুটির দুই হাতই প্লাস্টারে মোড়ানো। শিশুটির অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে আখিলাও দাবি করেছিলেন যে সে সাইকেল থেকে পড়ে আহত হয়েছে। ১ জুন প্রমাণ সংগ্রহের সময় বাড়ির আঙিনায় পরিত্যক্ত অবস্থায় শিশুটির ভাঙা হাতের প্লাস্টারও উদ্ধার করে পুলিশ।
নির্যাতনের কথা জানতেন মা
পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে আখিলা স্বীকার করেছেন, তিনি তার প্রেমিকের হাতে ছেলের ওপর চালানো ভয়াবহ নির্যাতনের বিষয়ে অবগত ছিলেন। তিনি জানান, একাধিকবার নিজের চোখে দেখেছেন আশকার হাত ও লাঠি দিয়ে শিশুটিকে মারধর করছেন। কিন্তু কোনো সময়ই তিনি ছেলেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেননি। পুলিশ বলছে, শিশুটির মৃত্যুর ঘটনায় হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও প্রমাণ নষ্টের অভিযোগে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।



