জন্মের পরপরই জন্মনিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার দাবি কারিতাসের
জন্মের পরপরই জন্মনিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার দাবি

শিশু জন্মের পরপরই হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে জন্মনিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা এবং পথশিশু ও অতিদরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য শর্তযুক্ত শিশু ভাতা চালুর দাবি জানিয়েছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কারিতাস বাংলাদেশ। একইসঙ্গে পিতামাতাহীন পথশিশুদের জন্মনিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করতে শুধু নীতিগতভাবে ঘোষণা নয়, তা কার্যকরভাবে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নেরও আহ্বান জানানো হয়েছে।

মিডিয়া পরামর্শ সভায় দাবি

বুধবার (২০ মে) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে কারিতাস বাংলাদেশ আয়োজিত এক মিডিয়া পরামর্শ সভায় এসব দাবি তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন কারিতাস ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের পরিচালক থিওফিল নকরেক। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ড উদ্যোগটি প্রশংসনীয় ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তবে যেসব শিশুর পরিবার নেই বা যারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট, ফুটপাত, বাজার কিংবা বস্তিতে বড় হচ্ছে, তারা এখনও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার বাইরে রয়ে গেছে।

জরিপের তথ্য

তিনি আরও বলেন, কারিতাস বাংলাদেশের পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, পথশিশুদের ৫৮ দশমিক ২ শতাংশের কোনও জন্মসনদ নেই। এছাড়া জন্মসনদবিহীন শিশুদের ৭১ দশমিক ৪ শতাংশ তাদের বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর জানে না। ফলে বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী জন্ম নিবন্ধন করা তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। জন্মসনদ না থাকা শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি একটি মানবাধিকার সংকট। জন্মসনদ না থাকলে শিশুরা বিদ্যালয়ে ভর্তি, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ, সরকারি ভাতা পাওয়া এবং ভবিষ্যতে নাগরিক অধিকার ভোগের ক্ষেত্রেও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জন্মনিবন্ধনের বাস্তবতা

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, জন্মগ্রহণের ৪৫ দিনের মধ্যে জন্মনিবন্ধন বাধ্যতামূলক হলেও বাস্তবে অধিকাংশ শিশুর নিবন্ধন সময়মতো হচ্ছে না। রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মোট জন্মনিবন্ধন হয়েছে ৮৩ লাখ ৬০ হাজার ৩৩৩ জনের; যার মধ্যে মাত্র ৯ শতাংশ শিশুর জন্মনিবন্ধন জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে শিশু জন্মের পরপরই হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে সরাসরি জন্মনিবন্ধনের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার দাবি জানানো হয়। একইসঙ্গে ওয়ার্ডভিত্তিক ও মোবাইল ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে পথশিশু ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

শিশু ভাতার প্রস্তাব

কারিতাস বাংলাদেশ জানায়, বর্তমানে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় মাসিক ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকার ভাতা বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে অত্যন্ত অপ্রতুল। এ জন্য পথশিশু ও অতিদরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য ‘শর্তযুক্ত শিশু ভাতা’ চালুর দাবি জানানো হয়। এ ধরনের কর্মসূচির আওতায় শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠানো, শিশুশ্রমে যুক্ত না করা এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করার শর্তে পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া যেতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়।

পথশিশুদের সংকট

লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, দারিদ্র্য, পারিবারিক সহিংসতা, নদীভাঙন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও সামাজিক বৈষম্যের কারণে শিশুরা পথে চলে আসে। পথশিশুরা প্রতিনিয়ত সহিংসতা, শোষণ ও শিশুশ্রমের শিকার হচ্ছে। অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হচ্ছে এবং মেয়েশিশুরা যৌন নির্যাতনের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত পথশিশু প্রতিনিধিরা বলেন, আমরা অনেক সময় না খেয়ে থাকি, হয়রানির শিকার হই। অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাই না। জন্মসনদ না থাকায় স্কুলে ভর্তি হতে পারিনি। আমাদের অনেকেই কাজ করতে বাধ্য হয়।

কারিতাসের দাবি

সভায় কারিতাস বাংলাদেশ সরকার প্রতি কয়েকটি দাবি তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে:

  • শিশু জন্মের পরপরই হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিকে জন্মনিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা;
  • পিতামাতাহীন পথশিশুদের জন্য সহজ করা জন্ম নিবন্ধন প্রক্রিয়া মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া;
  • ওয়ার্ডভিত্তিক বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে শতভাগ জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করা;
  • পথশিশু ও অতিদরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য শর্তযুক্ত শিশু ভাতা চালু করা;
  • পথশিশুদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, বিকল্প শিক্ষা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম সম্প্রসারণ;
  • সামাজিক নিরাপত্তা ভাতার পরিমাণ বাস্তবসম্মতভাবে বৃদ্ধি করা;
  • ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ করা।

সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান

কারিতাস বাংলাদেশের এসডব্লিউভিসি সেক্টরের ইনচার্জ চন্দ্র মনি চাকমা বলেন, কোনও শিশুই জন্মগতভাবে অবহেলিত নয়; সমাজ ও রাষ্ট্রের ব্যর্থতাই একটি শিশুকে পথে নামায়। তাই পথশিশু ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিতে সরকার, বেসরকারি সংস্থা ও সমাজের সবাইকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। সভায় অন্যান্যের মধ্যে, কারিতাস বাংলাদেশের এসডব্লিউভিসি সেক্টরের ইনচার্জ চন্দ্র মনি চাকমা, প্রোগ্রাম অফিসার কুসুম গ্রেগরি, অসীম ক্রুজ ও বারাকার প্রোগ্রাম অফিসার আন্থনী প্রিন্স গমেজসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি, পথশিশুদের প্রতিনিধি, অভিভাবকরা উপস্থিত ছিলেন।