আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, মানবাধিকার কমিশন যেন শুধু একটি ‘নখদন্তহীন’ প্রতিষ্ঠানে পরিণত না হয়, সেজন্য নতুন আইন তৈরি করা হচ্ছে। রোববার বিকেলে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ও গুম-সংক্রান্ত আইন’ প্রণয়নের লক্ষ্যে অংশীজনদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন আইনমন্ত্রী নিজেই।
নতুন আইনের বৈশিষ্ট্য
আইনমন্ত্রী বলেন, নতুন মানবাধিকার কমিশন আইনে আগের আইনের কিছু সীমাবদ্ধতা দূর করার চেষ্টা হয়েছে। আগের আইনে কমিশনের কার্যক্রম পরিচালনায় বিস্তৃত সময়সীমা দেওয়া ছিল। নতুন আইনে প্রতিটি স্তরে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া কমিশনের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) সুযোগ রাখা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আগের আইনে মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত, পরিদর্শন ও অনুসন্ধানের ক্ষমতা থাকলেও তাদের প্রতিবেদনের আলাদা কোনো আইনগত বা প্রমাণমূল্য ছিল না। নতুন আইনের মাধ্যমে কমিশনের প্রতিবেদনকে আদালতে আমলযোগ্য প্রমাণ (অ্যাডমিসিবল এভিডেন্স) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে আদালত প্রতিবেদন গ্রহণ করে এবং এর ভিত্তিতে বিচারিক প্রক্রিয়া আরও সমৃদ্ধ হয়।
স্বার্থের সংঘাত ও আন্তর্জাতিক চুক্তি
এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, কমিশন বা এর কর্মকর্তারা কোনো তদন্তে স্বার্থের সংঘাতে (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) জড়িয়ে পড়লে তা মোকাবিলার বিষয়েও আইনে বিধান রাখা হয়েছে। কোনো রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক মানবাধিকার-সংক্রান্ত চুক্তি বা দলিলে স্বাক্ষর করেও তা অনুসরণ না করলে, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো কীভাবে ব্যবস্থা নেবে, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট আইনে নির্দেশনা রয়েছে।
গুম-সংক্রান্ত আইন নিয়ে অসন্তোষ
গুম-সংক্রান্ত আইনের বিষয়ে আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমি মনে করি, গুম কমিশন আইনের খসড়াটি এমনভাবে করা হয়েছিল, অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে অপরাধীরা বেশি লাভবান হতো। এটা আমার ব্যক্তিগত মতামত। ফলে গুম কমিশন আইনের এই খসড়া নিয়ে এখন পর্যন্ত আমি নিজেও খুশি নই। আইনের প্রত্যেকটি লাইন আবার পড়ে দেখতে হবে। এটি নিয়ে আরও আলোচনা করার প্রয়োজন হবে।’
পরে সভায় অংশীজনেরা গুম আইনে অপরাধ তদন্তের ভার, সাজার মেয়াদসহ বেশ কিছু বিষয়ে পরামর্শ দেন। জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আগেই বলেছি, আমি নিজেও খসড়াটি নিয়ে খুব বেশি খুশি নই। গুম-সংক্রান্ত আইন নিয়ে দ্বিতীয় পরামর্শ সভায় যখন বসব, তখন বিষয়গুলো আরেকটু গুছিয়ে আনা সম্ভব হবে।’
তদন্তের বিষয়ে পরামর্শ
গুমের তদন্তের বিষয়ে এক পরামর্শে নূর খান লিটন বলেন, গুম নিয়ে বাহিনীগুলোর প্রধানদের কাছে আগে জবাব চাওয়া হলে, তাঁরা কোনো জবাব দেন না। দিলেও সেটি বানানো একটা জবাব দেন। একই সম্ভাবনা এখনো থেকে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমরা তাঁদের কাছে চাইতেও পারি, আবার তদন্ত শুরু করে দিতেও পারি—এমন বিধার রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
আইন প্রণয়নের সময়সীমা
কত দিনের মধ্যে আইন দুটি হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে আসাদুজ্জামান বলেন, সরকার গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন এবং গুম-সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের কাজ করছে। জাতীয় সংসদে আগামী বাজেট অধিবেশনের পরের অধিবেশনে এসব আইন উত্থাপন করার আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অংশীজনদের মতামত
খসড়া মানবাধিকার কমিশন আইনের বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘আইনের কিছু জায়গায় “সরকার” শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। আমার মনে হয়, এখানে “সরকার”-এর পরিবর্তে “রাষ্ট্র” শব্দ ব্যবহার করা অধিক উপযুক্ত হবে। কারণ, মানবাধিকার রক্ষা কোনো নির্দিষ্ট সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যেহেতু আইনমন্ত্রীও বলেছেন, এ আইন নিয়ে আরও সংশোধন ও পরিমার্জনের সুযোগ রয়েছে।’
সভায় মানবাধিকার বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলার। তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আন্তর্জাতিক জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান জোটের অধীনে ‘বি’ মর্যাদা ধরে রেখেছে। এটি দীর্ঘদিনের ঘাটতির একটি স্মারক। তবে এটাও জানা যে বাংলাদেশের ন্যায্য আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে ‘এ’ মর্যাদায় পৌঁছানো, যা প্যারিস নীতিমালার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। কমিশন আইনের এই সংশোধন অতীতের সীমাবদ্ধতা পেছনে ফেলে আরও শক্তিশালী একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার বিরল সুযোগ এনে দিয়েছে।
আইন দুটি নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে সভার পাশাপাশি গণশুনানি করার পরামর্শ দেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদ কে চৌধূরী। তিনি বলেন, আইনে বাছাই কমিটির সুপারিশে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে। এই শব্দটির পরিমার্জন করার পরামর্শ দেন তিনি। এ ছাড়া আইনে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী বা নারীদের মধ্যে যোগ্য কেউ থাকলে তাঁকে ‘বিশেষ বিবেচনায়’ রাখা হবে—এই প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ‘বিশেষ’ শব্দটি নিয়ে আপত্তি তোলেন। এটা তিনি না রাখার পরামর্শ দেন।
অতীত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, তদন্তের মধ্যে একধরনের ‘চেরি পিকিং’ বা নিজেদের পছন্দমতো বাছাই হয়—কোনটা তদন্ত করা হবে, কোনটা করা হবে না। তিনি বলেন, ‘অতীতে আমরা যখন তদন্তের দাবি করেছি, তখন বলা হয়েছে তাদের (জাতীয় মানবাধিকার কমিশন) লোকবল নেই, ক্ষমতা নেই। তদন্ত নিয়ে একটা স্পষ্ট গাইডলাইন (নির্দেশিকা) যেন রাখা হয়।’ বিষয়টি যেন আরও শক্তিশালী করা হয়, সেই পরামর্শ দেন তিনি।



