হাতে শক্ত করে ধরে রেখেছেন জাতীয় পতাকা, আরেকটি পতাকা জড়িয়ে রেখেছেন মাথায়। কথা বলতে না পারলেও হাতের ইশারা–ইঙ্গিতে ক্যামেরার সামনে বোঝানোর চেষ্টা করছেন—তাঁদের দেওয়া ভাতা বা সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। পাশে থাকা আরেকজন পাঁচ আঙুল তুলে কিছু বোঝাতে চান, কেউ আবার বাঁশি বাজিয়ে নিজেদের দাবির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে মাথায় জাতীয় পতাকা বাঁধা সেই ব্যক্তি যেন ভাষাহীন প্রতিবাদের শেষ উপায় হিসেবে সামনে থাকা ব্যানারের লেখার দিকে আঙুল তুলে ধরেন। ব্যানারে দেখা যায়, ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বধির ও বাক্প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা ১৫ দফা দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন।
ভিডিওর সত্যতা যাচাই
এই ভিডিওটি কিশোরগঞ্জের সাবেক বিএনপি নেতা ফয়জুল করিম মুবিনের নাম ব্যবহার করা একটি ফেসবুক পেজ থেকে ছড়ানো হচ্ছে। 'এ্যাডঃ ফয়জুল করিম মুবিন' নামের ফেসবুক পেজ থেকে ১১ মে প্রচার করা হয় ২১ সেকেন্ডের ভিডিওটি। এর ক্যাপশনে দাবি করা হয়, 'এরা বাক্প্রতিবন্ধী। শেখ হাসিনার সময় তাদের জন্য প্রতিবন্ধী ভাতা চালু করেছিল, আজ তাদের সেই ভাতাটাও নেই।' ভিডিওটি দুই লাখের বেশিবার দেখা হয়েছে, শেয়ার হয়েছে এক হাজারবারের বেশি, এতে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন পাঁচ হাজার জন।
একাধিক পেজে একই ভিডিও
একই ভিডিও বিভিন্ন জায়গায় পোস্ট করে দাবি করা হয়েছে, 'এই বাক্প্রতিবন্ধীদের জন্য শেখ হাসিনার সরকার প্রতিবন্ধী ভাতা চালু করেছিল, আজ তাঁদের সেই ভাতাটাও নেই। ঢাকা প্রেসক্লাবে এমনটাই তাঁরা বলছিলেন।' 'এ্যাডঃ ফয়জুল করিম মুবিন' নামে ফেসবুক পেজ থেকে পোস্ট করা ভিডিওটির ডান পাশে 'আওয়ামী লীগ সাপোর্টার্স' নামের একটি লোগো দেখা যায়। একই ভিডিও ও ক্যাপশন ব্যবহার করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নামে পরিচালিত একাধিক ফেসবুক পেজ ও ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকেও একই ধরনের দাবি ছড়ানো হয়েছে। অনুসন্ধান চালিয়ে ৩৫টির বেশি ফেসবুক পেজ ও প্রোফাইলে ভিডিওটি পাওয়া গেছে। সেসব পোস্টে ভিডিওটি কয়েক লাখ বার দেখাও হয়েছে।
মন্তব্যের ঘরে বিভ্রান্তি
পোস্টগুলোর মন্তব্যের ঘরে অনেকের লেখায় বোঝা যাচ্ছে, প্রতিবন্ধী ভাতা বাতিলের খবরটি সত্য বলেই ধরে নিয়েছেন তাঁরা। মামুন মাতবর নামে একজন লিখেছেন, 'ছি ছি, ধিক্কার জানাই তারেক রহমান সরকারকে, প্রতিবন্ধী ভাতা দেওয়া বন্ধ হয়ে গেল।' ফোরকান নামে একজন লিখেছেন, 'আল্লাহর গজব পড়ুক যারা এই অসহায় বাক্প্রতিবন্ধী, বিধবা, বৃদ্ধ ভাতার রাস্তা বন্ধ করে দিল তাদের ওপর।'
ভিডিওর প্রকৃত ঘটনা
প্রতিবন্ধী ভাতা বাতিলের দাবি করে পোস্ট করা ভিডিওটি নিয়ে ফয়জুল করিম মুবিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, 'তার নামে কোনো ফেসবুক পেজ নেই।' ভিডিওটির বিষয়ে অনুসন্ধান করে গত ১০ মে 'Awaz News' নামে একটি ফেসবুক পেজে একই ভিডিও পাওয়া যায়। সেখানে ক্যাপশনে লেখা ছিল, 'শ্রবণপ্রতিবন্ধীরা জড়ো হয়েছে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে।' পেজটি পর্যালোচনা করে একই ঘটনার একাধিক ভিডিও পাওয়া যায়। কোথাও ক্যাপশনে কিংবা ভিডিওর লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে, 'ভাতা অনেক কম, ৩ মাসে মাত্র ২৫০০ টাকা', 'প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা ভাতা চায় শ্রবণপ্রতিবন্ধীরা', 'পরিবহনে হাফ ভাড়া দিতে চায় প্রতিবন্ধীরা', 'ইশারার মাধ্যমে নিজেদের কষ্ট ও দাবি জানালেন বাক্প্রতিবন্ধীরা' এবং '১৫ দফা দাবি নিয়ে শ্রবণপ্রতিবন্ধীদের মানববন্ধন।'
সরকারের আশ্বাস
একই দিনে দৈনিক সমকালের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকেও জানা যায়, সেদিন ১৫ দফা দাবি নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বধির বা শ্রবণপ্রতিবন্ধীরা মানববন্ধন করেন। বেসরকারি একটি টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিবেদনে দেখা যায়, জাতীয় বধির ঐক্য পরিষদের সভাপতি জহিরুল ইসলাম সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ইন্টারপ্রেটারের (সহায়ক ব্যক্তি) মাধ্যমে জানান, তাঁরা ১৫টি দাবি তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে সরকারি ভাতা দ্বিগুণ করে ৫ হাজার টাকা করা, বিনা মূল্যে চিকিৎসা, যাতায়াতে অর্ধেক ভাড়া এবং কর্মসংস্থানের দাবি ছিল। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচির পর সরকারের পক্ষ থেকে কেউ তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন কি না, সেটিও জানা যায়। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে জাতীয় বধির ঐক্য পরিষদের সাত সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল সাক্ষাৎ করে। এ সময় প্রতিমন্ত্রী তাদের আশ্বস্ত করেন, দাবিদাওয়ার বিষয়গুলো শোনা হবে এবং দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ভুল তথ্য ছড়ানোর অপচেষ্টা
'Awaz News' নামের ফেসবুক পেজে ১০ মে আরও দুটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। সেগুলো থেকে জানা যায়, সরকারের আশ্বাসের পর আন্দোলনকারীরা কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন। ভিডিওগুলোর ক্যাপশনে লেখা ছিল, 'প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় আল্লাহর জমিনে সিজদা করলেন বধিররা' এবং 'দাবি পূরণ হচ্ছে শুনেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য দোয়া করলেন বধিররা।' বর্তমান সরকার প্রতিবন্ধী ভাতা বন্ধ করে দিয়েছে—এমন দাবির বিষয়ে জানতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (সামাজিক নিরাপত্তা–০৩) শিলা রানী দাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো প্রতিবন্ধী ভাতা বন্ধের তথ্যটি সত্য নয়, এটি ভুল তথ্য। বরং প্রতিবন্ধী ভাতার আওতা আরও বাড়ানোর কাজ চলছে। পাশাপাশি প্রতিবন্ধীদের সব স্থানে প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করতে নতুন সুপারিশ করা হয়েছে, যা আগামী বাজেটে প্রতিফলিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, 'যেসব পরিবারে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছেন, সেসব পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রেও অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তাই প্রতিবন্ধী ভাতা বাতিলের দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা।'
সুতরাং, বর্তমান সরকার প্রতিবন্ধী বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ভাতা বন্ধ করে দিয়েছে, এমন দাবিটি ঠিক নয়। বরং ভাতার পরিমাণ বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলনকারীরা সরকারের আশ্বাস পেয়ে কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেন। ভুয়া খবর ছড়িয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চলছে, যা থেকে সাবধান থাকা প্রয়োজন।



