মৌলভীবাজার শহরের মুসলিম কোয়ার্টার এলাকার একটি বাসা থেকে শুক্লা সিনহা শুশ্রী (২৪) নামে এক তরুণীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বুধবার (১৩ মে) সন্ধ্যায় প্রতিবেশীরা তার কক্ষে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেন। খবর পেয়ে মৌলভীবাজার মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে। নিহত শুক্লা মৌলভীবাজার আধুনিক চক্ষু হাসপাতালের রিসিপশনিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
পরিবার ও চাকরি
শুক্লা কমলগঞ্জ উপজেলার তিলোকপুর গ্রামের রঞ্জিত সিনহা ও লক্ষ্মী রানী সিনহা দম্পতির বড় মেয়ে। চাকরির সুবাদে শহরের মুসলিম কোয়ার্টার এলাকার ওই বাসার ষষ্ঠ তলায় একাই বসবাস করতেন। তিনি শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ও অবিবাহিত ছিলেন।
প্রাথমিক তদন্ত
প্রাথমিকভাবে স্থানীয় লোকজন আত্মহত্যা বলে ধারণা করলেও এটি পরিকল্পিত হত্যা কিনা সে বিষয়ে তদন্ত করছে পুলিশ। মৌলভীবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শুক্লার লাশ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠিয়েছে। এটি আত্মহত্যা নাকি এর পেছনে অন্য কোনও রহস্য আছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ঘটনার বিভিন্ন দিক তদন্ত শুরু হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।’
ঘটনার বিবরণ
পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন জানান, বুধবার সারাদিন শুক্লার কক্ষের দরজা বন্ধ থাকায় আশপাশের লোকজনের সন্দেহ হয়। ডাকাডাকি করেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে ভেতরে ঝুলন্ত অবস্থায় লাশ দেখেন তারা।
জেলায় ধারাবাহিক লাশ উদ্ধার
এ নিয়ে গত ছয় দিনে জেলায় পাঁচ জনের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ধারাবাহিকভাবে লাশ উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে শুক্লাসহ কয়েকজনের মৃত্যু রহস্যজনক হওয়ায় মানুষের অনেকে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। ঘটনাগুলো তদন্ত করে রহস্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তারা।
অন্যান্য ঘটনা
বুধবার (১৩ মে) সন্ধ্যায় শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালাপুর ইউনিয়নের রাজাপুর এলাকায় মাহমুদ আলী (৩০) নামে যুবকের লাশ পানিতে ভাসতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দিলে লাশ উদ্ধার করা হয়। তিনি শহরতলীর নোয়াগাঁও এলাকার আছকর আলীর ছেলে। পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার রাতে কোনও একসময় মাছ ধরার সরঞ্জাম নিয়ে হাইল হাওরে গিয়ে আর ফেরেননি বলে জানায় মাহমুদের পরিবার। ধারণা করা হচ্ছে, হয়তো পা পিছলে হাওরের পানিতে পড়ে আর উঠতে পারেননি। এ ঘটনার রহস্য উদঘাটনে তদন্ত শুরু হয়েছে।
শ্রীমঙ্গল থানার ওসি শেখ জহিরুল ইসলাম মুন্না বলেন, ‘খবর পেয়ে নিহতের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা তা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।’
এর আগে ৯ মে সকালে কুলাউড়া উপজেলার জয়চণ্ডী ইউনিয়নের মীরবক্সপুর এলাকার একটি কালভার্টের নিচ থেকে প্রদীপ তেলি (৩০) নামে এক যুবকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত প্রদীপ তেলি গাজীপুর চা বাগানের অনিল তেলীর ছেলে। কুলাউড়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ফরহাদ মাতব্বর জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে নিহত ব্যক্তি মদ্যপ অবস্থায় কালভার্টের পাশে বসেছিলেন। অসাবধানতাবশত কালভার্ট থেকে নিচে পড়ে যান। নিচে পড়ার ফলে মাথা ও ঘাড়ে গুরুতর আঘাত পান এবং ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়। বিষয়টি নিয়ে অধিকতর তদন্ত চলছে।
৯ মে শ্রীমঙ্গল উপজেলায় পানিতে ডুবে মোহাম্মদ হোসেন (৫৪) নামে এক রিকশাচালকের মৃত্যু হয়। উপজেলার কালিঘাট ইউনিয়নের ভাড়াউড়া চা-বাগানের রামপাড়া এলাকায় অজয় হাজারার বসতবাড়ির পুকুরে এ ঘটনা ঘটে। নিহত মোহাম্মদ হোসেন কুমিল্লার লাকসাম থানার আলোকদিয়া ইউনিয়নের খোজারকলা গ্রামের মৃত শরবত আলীর ছেলে। শ্রীমঙ্গল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুর রাজ্জাক জানান, নিহত ব্যক্তি মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই সিলেট অঞ্চলে বসবাস করতেন এবং শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশন এলাকায় হাসিম পাগলা নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি পেশায় রিকশাচালক ছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় চলাফেরা করতেন।
তার আগে ৭ মে শ্রীমঙ্গলের ভাড়াউড়া চা-বাগান এলাকার একটি পুকুর থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। শ্রীমঙ্গল ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ইউনিটের একটি ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুকুরের পানি থেকে লাশটি উদ্ধার করে। ফায়ার সার্ভিস জানায়, উদ্ধারের পর লাশটির পরিচয় শনাক্তের জন্য শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তার নাম-পরিচয় নিশ্চিত করতে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।
তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া
পুলিশ জানিয়েছে, মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয় ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চলমান রয়েছে। চা-বাগান এলাকায় পুকুরে অজ্ঞাত লাশ পাওয়ার এই ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। শ্রীমঙ্গল থানার ওসি শেখ জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘অজ্ঞাত ওই লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে।’



