হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) জুন মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৯ জন নিহত এবং ৩৪৬ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন কারণে সংঘটিত সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় নিহত হয়েছেন আরও ৩১ জন। এ ছাড়া ৩৫২ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং ৩৯টি ঘটনায় ৪৭ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। বৃহস্পতিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি জানিয়েছে, দেশের ১৬টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ, এইচআরএসএসের নিজস্ব তথ্য সংগ্রহ এবং ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এ মাসিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে।
রাজনৈতিক সহিংসতার বিস্তারিত
প্রতিবেদনে বলা হয়, জুন মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ৫৮টি ঘটনায় ৯ জন নিহত ও ৩৪৬ জন আহত হন। মে মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৫ জন নিহত ও ২৮৯ জন আহত হন। জুনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ২১টি ঘটনায় ৩ জন নিহত ও অন্তত ১৪৬ জন আহত হন। বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষের ৮টি ঘটনায় ২ জন নিহত ও ৩৬ জন আহত এবং বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষের ১৪টি ঘটনায় ২ জন নিহত ও ১১৫ জন আহত হন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপির ৫ জন, আওয়ামী লীগের ৩ জন এবং একটি চরমপন্থী দলের একজন সদস্য রয়েছেন।
আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, দলীয় কোন্দল ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে বেশির ভাগ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। দুষ্কৃতকারীদের হামলায় রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ওপর অন্তত ১২টি ঘটনায় ৯ জন নিহত ও ২২ জন আহত হন। এ ছাড়া রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ১৫ জন গুলিবিদ্ধ হন এবং ৪৫টি ঘটনায় বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
রাজনৈতিক মামলা ও গ্রেপ্তার
রাজনৈতিক মামলার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, জুনে বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ২২টির বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৬২৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও প্রায় ১ হাজার ২৬২ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। একই সময়ে রাজনৈতিক ও অন্যান্য মামলায় মোট ২৫৭টি ঘটনায় অন্তত ৪ হাজার ৭৭৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অন্তত ১ হাজার ৫৫৯ জন, বিএনপির ৩৫ জন এবং জামায়াতে ইসলামীর ২ জন রয়েছেন।
গণপিটুনি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা
এইচআরএসএস জানায়, জুনে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্মীয় অবমাননা, আধিপত্য বিস্তারসহ নানা অভিযোগে সংঘটিত ৬৩টি ‘মব’ সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় অন্তত ৩১ জন নিহত এবং ৬৯ জন আহত হন। এ ছাড়া ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, অভিযান পরিচালনা ও আসামি ছিনতাই ঠেকাতে গিয়ে বা স্থানীয় জনতার হামলায় ২৯টি ঘটনায় ৬৬ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য আহত বা হামলার শিকার হন।
সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন
সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতনের ঘটনায় প্রতিবেদনে বলা হয়, জুনে ৩৯টি ঘটনায় ৪৭ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ২৮ জন আহত, ৫ জন লাঞ্ছিত এবং ৯ জন হুমকির মুখে পড়েন। এ ছাড়া ৫ জন সাংবাদিককে আটক এবং ৭টি মামলায় ১২ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়।
সভা-সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
সভা-সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। প্রতিবেদনে বলা হয়, জুনে ৬টি সভা-সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাধার ঘটনায় ১৭ জন আহত ও ৩৬ জন আটক হন। একই সময়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অন্তত ১১টি ঘটনায় ১১ জনকে আটক এবং ৭টি মামলা করা হয়। এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্যের জেরে গ্রেপ্তার ও আইনি পদক্ষেপের ঘটনাকে নতুন উদ্বেগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিচারবহির্ভূত হত্যা ও হেফাজতে মৃত্যু
বিচারবহির্ভূত হত্যা ও হেফাজতে মৃত্যু প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, জুনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, হেফাজত ও নির্যাতনে তিনজন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে ২ জন কথিত বন্দুকযুদ্ধে এবং একজন ডিবি হেফাজতে নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যান। গ্রেপ্তার এড়াতে পালাতে গিয়ে আরও চারজনের মৃত্যু হয়। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন কারাগারে সাতজন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে।
সংখ্যালঘু ও সীমান্ত পরিস্থিতি
প্রতিবেদনে বলা হয়, জুনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ১২টি হামলার ঘটনায় ৭ জন আহত হন। এ সময় ১২টি মন্দির, ১১টি প্রতিমা ও ৭টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পাশাপাশি একজন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নারী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন। সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৫টি ঘটনায় ২ জন নিহত, ২ জন আহত ও ৪ জন গুলিবিদ্ধ হন। বিএসএফ একজনকে আটক করে। এ ছাড়া ৭ জনকে পুশ ইন করা হয়েছে এবং ৪ শতাধিক নারী, পুরুষ ও শিশুকে পুশ ইনের চেষ্টা করা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে পৃথক তিনটি ঘটনায় এক রোহিঙ্গাসহ ৩ জন নিহত হন।
শ্রমিক ও নারী-শিশু নির্যাতন
শ্রমিক অধিকার প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, জুনে শ্রমিক নির্যাতনের ৫৫টি ঘটনায় ১১ জন নিহত ও ১৮৪ জন আহত হন। কর্মস্থলে নিরাপত্তাহীনতা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে দুর্ঘটনায় আরও ৩৯ জন শ্রমিক মারা যান। বেতন-ভাতার দাবিতে আন্দোলনের সময় ২৬ জন পোশাকশ্রমিককে আটক করা হয়। নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, জুনে মোট ৩৫২ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হন। তাঁদের মধ্যে ১০৬ জন ধর্ষণের শিকার, যার ৭৫ জনই ১৮ বছরের কম বয়সী। এ ছাড়া ১৯ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন এবং ধর্ষণের পর ২ কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়। একই সময়ে ৯৪ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হন। পারিবারিক সহিংসতায় ৫৭ জন নারী নিহত, ৪৮ জন আহত এবং ৩৬ জন আত্মহত্যা করেছেন। পাশাপাশি ২৯১ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।



