যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য চুক্তির খসড়া নিয়ে আলোচনা চলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার ইরানের সাথে একটি 'সমঝোতা স্মারক' (এমওইউ) স্বাক্ষরের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন। ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, এখনো কোনো খসড়া এমওইউ অনুমোদিত হয়নি। তবে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের প্রস্তাব গ্রহণ করে, তাহলে ইরানও তাতে সাড়া দিতে পারে।
পারমাণবিক কর্মসূচি প্রধান বাধা
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। বিশেষ করে, প্রায় ৪০০ কেজি (৯৭০ পাউন্ড) ইউরেনিয়াম যা ৬০% পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা হয়েছে। আরও সমৃদ্ধ করলে এই উপাদান তাত্ত্বিকভাবে কয়েকটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে যথেষ্ট হতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরোধ করতে চায়। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, 'ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার ও সমৃদ্ধ উপাদান ধরে রাখা' চূড়ান্ত চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হবে।
সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে বিরোধ
ইরান তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে দেখছে এবং তা ছেড়ে দিতে রাজি নয়। দেশটি নিজেই উপাদানটি নিম্ন সমৃদ্ধকরণ স্তরে রূপান্তরের প্রস্তাব দিয়েছে, তবে শর্ত হিসেবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার চায়। তৃতীয় দেশের সম্পৃক্ততাও সম্ভাব্য সমঝোতা হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। রাশিয়া ইরানের উচ্চসমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিজ দেশে নিরাপদ সংরক্ষণ বা প্রক্রিয়াকরণের প্রস্তাব দিয়েছে। চীনও মধ্যস্থতাকারী ও লজিস্টিক অংশীদার হিসেবে নতুন চুক্তিতে জড়িত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।
অর্থনৈতিক দিক
পারমাণবিক ইস্যুর পাশাপাশি অর্থনৈতিক দিকও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিদেশে জব্দ করা ইরানি সম্পদ, যা ১০০ বিলিয়ন ডলারের (৮৬ বিলিয়ন ইউরো) কাছাকাছি, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এই তহবিলের বেশিরভাগই তেল রপ্তানি থেকে আসে যা দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও জাপানের মতো দেশে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে আটকে আছে। তেহরান ৬ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড় ও নিষেধাজ্ঞা শিথিলের দাবি করছে। অন্যদিকে, মার্কিন সরকার শুধুমাত্র ধীরে ধীরে এবং মানবিক উদ্দেশ্যে তহবিল ছাড়তে চায়। ওয়াশিংটনের কর্মকর্তারা ইরানের জব্দকৃত সম্পদের অংশ ব্যবহার করে পারস্য উপসাগরে মার্কিন মিত্রদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা করছেন।
মার্শাল প্ল্যান নাকি ইরাকের পুনরাবৃত্তি?
ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, চুক্তি ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পুরো অবকাঠামো ধ্বংস করতে বাধ্য হবে এবং পুনর্নির্মাণে সহায়তা করবে, যাকে তিনি 'মার্শাল প্ল্যান' বলে অভিহিত করেছেন। তবে ইরান তার তেল সম্পদের ওপর কোনো বিদেশি নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে। প্রতিবেশী ইরাকের অভিজ্ঞতা জনমনে প্রভাব ফেলেছে, যেখানে ২০০৩ সালে মার্কিন আক্রমণের পর ইরাকের তেল রাজস্বের একটি বড় অংশ কার্যকরভাবে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে পরিচালিত হয়।
হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ
যেকোনো চুক্তির পর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে হরমুজ প্রণালী দিয়ে শিপিং ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করা হবে এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়া হবে। এই কৌশলগত জলপথে বিঘ্ন ইতিমধ্যে বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি মূল্যে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে। ৮ এপ্রিল থেকে যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও পারস্য উপসাগরে প্রায় প্রতিদিন সামরিক সংঘর্ষ চলছে। ইরান হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে রাজি নয় বলে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।



