যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি ইসরায়েলে ক্ষোভ চরমে পৌঁছেছে। দেশটির প্রভাবশালী ‘চ্যানেল ১৪’-এর প্রাইমটাইম শোর উপস্থাপক ইনন মাগাল ট্রাম্পকে সরাসরি ‘লুজার’ বলে অভিহিত করেছেন। এমনকি ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফকে ‘ক্ষুদ্র ইহুদি’ বলে কটাক্ষ করেছেন।
বিশ্লেষকদের সুরে ১৮০ ডিগ্রি পরিবর্তন
ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইয়াকভ বারদুগো মন্তব্য করেছেন, ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এখন আধুনিক যুগের ‘চেম্বারলেন’-এ পরিণত হচ্ছেন, যেখানে ১৯৩৮ সালে হিটলারের প্রতি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলেনের তোষণনীতির কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। ডানপন্থী ‘চ্যানেল ১৪’-এর সঞ্চালক শিমন রিকলিন এক্সে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে এবং ভবিষ্যতে কেউ তার মিত্র হতে চাইবে না। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এই বিশ্লেষকদের সুর এখন ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে।
ট্রাম্পের প্রতি ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা
গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসনের পক্ষে ট্রাম্প শুরু থেকেই শক্ত অবস্থান নিয়ে আসছেন। অন্যদিকে কুশনার ছিলেন তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর মূল পরিকল্পনাকারী। হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে নেতানিয়াহু ও মোসাদপ্রধান ডেভিড বার্নিয়ার ব্রিফিংয়ের পরেই ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। মার্কিন ইতিহাসে কোনো বিদেশি নেতার সিচুয়েশন রুমে প্রবেশের এটাই প্রথম ঘটনা। অথচ আজ সেই ট্রাম্পকেই তারা ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে আখ্যা দিচ্ছে।
জায়নবাদের ঐতিহাসিক পুনরাবৃত্তি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেন ফিলিস্তিনে এক লাখ ইহুদির অভিবাসনে নিষেধাজ্ঞা দেয়, যার প্রতিবাদে ইহুদি ভূগর্ভস্থ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো একজোট হয়। ১৯৪৫ থেকে ১৯৪৮ সালের মধ্যে ফিলিস্তিনে ৭৮০ জনের বেশি ব্রিটিশ সেনা, পুলিশ ও বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। সবচেয়ে ভয়াবহ হামলাটি ঘটে ১৯৪৬ সালের ২২ জুলাই জেরুজালেমের কিং ডেভিড হোটেলে, যেখানে ৯১ জন নিহত হন, যাঁদের মধ্যে ২৮ জন ছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক। আজ পর্যন্ত ইসরায়েল সেই নিহত ব্যক্তিদের কবরকে সম্মান জানাতে অস্বীকৃতি জানালেও হোটেলে বোমা হামলার নেতৃত্বদাতাদের বীরের মর্যাদা দিয়ে আসছে। হলোকাস্টের সময় চার হাজারের বেশি ইহুদিকে মুক্ত করা সুইডিশ কূটনীতিক কাউন্ট ফোল্কে বার্নাডোটও এই ইহুদি সন্ত্রাসীদের হাত থেকে রেহাই পাননি।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টদের প্রতি অকৃতজ্ঞতা
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ইসরায়েলকে ১০ বছর মেয়াদে ৩৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়েছিলেন, যা ছিল মার্কিন ইতিহাসের বৃহত্তম প্যাকেজ। ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ আভি শ্লাইম সে সময় ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ানে লিখেছিলেন, ‘নেতানিয়াহু ওবামার এই উদারতার জবাব দিয়েছেন চরম অকৃতজ্ঞতা দিয়ে। তিনি ওবামাকে আক্রমণ করার কোনো সুযোগই হাতছাড়া করেননি। যেভাবে বাইডেনকে নজিরবিহীনভাবে তিরস্কার করেছেন, তা চরম অকৃতজ্ঞতা এবং একটি প্রথম সারির কৌশলগত ব্যর্থতা।’
জায়নবাদের আসল ‘শ্রেষ্ঠত্ববাদী’ রূপ
নেতানিয়াহু সরকারের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোশে ইয়ালন এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সঙ্গে যুক্ত ধর্মীয় জায়নবাদী আন্দোলনের একটি অংশ মূলত ‘ইহুদি শ্রেষ্ঠত্ববাদী আদর্শ’ ধারণ করে। তিনি আরও যোগ করেন, ‘ইহুদি শ্রেষ্ঠত্ববাদ আসলে হিটলারের “মাইন কাম্ফ”–এর উল্টো সংস্করণ মাত্র।’
মার্কিন জনমতে সুনামি
পিউ রিসার্চের এক জরিপে দেখা গেছে, ৫০ বছরের কম বয়সী অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক ইসরায়েল ও নেতানিয়াহুকে নেতিবাচকভাবে দেখেন। বর্তমানে ১৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সী রিপাবলিকানদের মধ্যে ৫৭ শতাংশই ইসরায়েলের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন। সামগ্রিকভাবে ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিকের এখন ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে।
নির্বাচনে ইসরায়েলপন্থী লবির পরাজয়
নিউইয়র্কে ডেমোক্রেটিক পার্টির তিনজন বর্তমান কংগ্রেস সদস্য পুনর্নির্বাচনে হেরে গেছেন এবং মেয়র জোহরান মামদানি সমর্থিত প্রার্থীরা পাঁচটি স্থানীয় আসনে জয়লাভ করেছেন। কলোরাডোর প্রথম সংসদীয় আসন থেকে ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে বিজয়ী হন আইনজীবী ও পিএইচডি শিক্ষার্থী মেলাত কিরোস, যিনি ইসরায়েলপন্থী লবিং গ্রুপ ‘আইপ্যাক’ থেকে ১৬ লাখ ডলারের বেশি অনুদান পাওয়া ডায়ানা ডিগেটকে হারিয়ে দেন। ‘জিউইশ ভয়েস ফর পিস-অ্যাকশন’ বলেছে, এই নির্বাচন প্রমাণ করেছে যে ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরে ‘আইপ্যাক’ এখন একটি ‘বিষাক্ত ব্র্যান্ড’-এ পরিণত হয়েছে।
ফিলিস্তিন ইস্যু মূলধারায়
একসময় যা বামপন্থীদের একটি নির্দিষ্ট এজেন্ডা কিংবা ‘ইসলামপন্থা’ বা ‘সন্ত্রাসবাদ’-এর তকমা দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হতো, তা এখন মার্কিন রাজনৈতিক মহলের সব স্তরে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন ডানপন্থীদের একটি অংশও এখন ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় বোঝা হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। তবে ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের মৌলিক বিষয়গুলো এখনো মার্কিন নীতিনির্ধারণী মহলের ‘ভদ্র ও গ্রহণযোগ্য’ বিতর্কের কাঠামোর বাইরেই থেকে গেছে। ড্যানিয়েল লেভির মতে, ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন সমর্থন পুনর্মূল্যায়নের এই যাত্রা অত্যন্ত দীর্ঘ এবং আমেরিকা কেবল এর সূচনালগ্নে রয়েছে।



