যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, সব ইহুদি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর বিরক্ত। এমনকি এক ফোনালাপে তিনি এ দুই ঘনিষ্ঠ মিত্রদেশের মধ্যে বিচ্ছেদ বা সম্পর্ক ছিন্নের হুমকিও দিয়েছিলেন।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক ম্যাগি হ্যাবারম্যান ও জোনাথন সোয়ানের লেখা নতুন একটি বইয়ে এ দাবি করা হয়েছে। বইটির নাম ‘রেজিম চেঞ্জ: ইনসাইড দ্য ইম্পেরিয়াল প্রেসিডেন্সি অব ডোনাল্ড ট্রাম্প’।
গতকাল মঙ্গলবার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বইটির কিছু অংশ প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই নেতার মধ্যে এ উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছিল ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। ওই সময় ট্রাম্প গাজা নিয়ে তাঁর তৈরি করা একটি শান্তি পরিকল্পনা মেনে নিতে ইসরায়েলের ওপর চাপ দিচ্ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট তাঁর বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনারের উপস্থিতিতে নেতানিয়াহুর সঙ্গে ওই ফোনালাপ করেন।
ট্রাম্পের কড়া ভাষা
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েল-এর তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে বলেছিলেন, ‘বিবি (নেতানিয়াহুর ডাকনাম), সবাই তোমার ওপর বিরক্ত। সব ইহুদি তোমার ওপর বিরক্ত। এমনকি এ ফোনে থাকা দুই ইহুদিও (কুশনার ও উইটকফ) তোমার ওপর বিরক্ত।’
যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য ইনডিপেনডেন্ট-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প আরও বলেন, ‘সবাই তোমাকে ঘৃণা করে, আর আমি তোমার পাশে দাঁড়িয়েছি।’ তিনি সতর্ক করে বলেন যে ইসরায়েল এই চুক্তি (গাজা নিয়ে ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা) মেনে না নিলে দুই দেশের মধ্যে ‘বিচ্ছেদ’ ঘটবে।
সম্পর্কের ওঠানামা
অথচ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরু হওয়ার প্রথম কয়েক সপ্তাহে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু তাঁদের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার বেশ প্রশংসা করেছিলেন। কিন্তু ইরানকে কাবু করার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়া এবং শান্তি আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ার পর ট্রাম্প ক্রমে ইসরায়েলের প্রতি সমালোচনামুখর হয়ে ওঠেন। ইরান আলোচনা থেকে সরে যাওয়ার হুমকি দেওয়ার পর লেবাননে ইসরায়েলি হামলার তীব্র নিন্দা জানান ট্রাম্প। একপর্যায়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে নেতানিয়াহুর ‘কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই’ এবং তিনি নেতানিয়াহুকে ‘উন্মাদ’ বলেও আখ্যা দেন।
গোয়েন্দা সতর্কতা
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোস্ট-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সম্প্রতি ট্রাম্পকে সতর্ক করেছে যে ইরানের সঙ্গে একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নেতানিয়াহু বাধা সৃষ্টি করার চেষ্টা করতে পারেন।
অবশ্য দুই নেতাই নিজ দেশে সমালোচনার মুখে পড়েছেন। বিরোধীদের দাবি, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে অন্তর্বর্তী চুক্তি সই হয়েছে, তা ট্রাম্পের যুদ্ধের ঘোষিত লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে।
শান্তি পরিকল্পনা অনুমোদন
উল্লেখ্য, ওই উত্তপ্ত ফোনালাপের দুই দিন পর ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ‘গাজা শান্তি পরিকল্পনা’র ঘোষণা দেন। পরে নভেম্বরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদও এটি অনুমোদন করে।
নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিকদের লেখা বইটিতে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যকার এ উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের মতো আরও বেশ কিছু তুমুল বিতর্কের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তাঁর প্রশাসনের ভেতরের নানা গোপন ও ঘনিষ্ঠ বিবরণ উঠে আসায় বইটি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
বইয়ে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য
বইটিতে ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যকার বেশ কিছু সংবেদনশীল আলোচনার বিবরণ রয়েছে। বিশেষ করে কুখ্যাত যৌন অপরাধী এপস্টেইন ফাইল কেলেঙ্কারির ধাক্কা ট্রাম্পের সামলানো ও ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলা করার সময়কার ভেতরের নানা তথ্য এতে উঠে এসেছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এ বইয়ের যেসব অংশ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তা নিয়ে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কিছু কর্মকর্তা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে হোয়াইট হাউসের অত্যন্ত সুরক্ষিত ‘সিচুয়েশন রুম’-এর ভেতরে হওয়া কথোপকথনের কোনো রেকর্ডিং হয়তো বাইরে ফাঁস হয়ে গেছে।



