ন্যাটো সম্মেলনে শুরুতে বিশৃঙ্খলা, শেষে ‘প্রচুর ঐক্য ও ভালোবাসা’ দাবি ট্রাম্পের
ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্পের সুর বদল: ‘প্রচুর ঐক্য ও ভালোবাসা’

তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো নেতাদের শীর্ষ সম্মেলনে শুরুতে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলেও পরবর্তীতে সুর পাল্টেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার (৮ জুলাই) স্পেনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সম্পর্ক ছিন্ন করার নির্দেশ এবং ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের ওপর নতুন করে দাবি তুলে তিনি সম্মেলনকে উত্তপ্ত করে তোলেন। তবে রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে তিনি দাবি করেছেন, সম্মেলনে নেতাদের মধ্যে ‘ভালোবাসা এবং প্রচুর ঐক্য’ বিরাজ করছে। এর আগে তিনি ভঙ্গুর ইরান চুক্তিকে ‘মৃত’ ঘোষণা করেন এবং ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট মিসাইল তৈরির অনুমতি দেওয়ার কথাও জানান।

স্পেনের প্রতি ট্রাম্পের হুমকি ও বাণিজ্য ছিন্নের নির্দেশ

আঙ্কারায় ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের পাশে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প স্পেনের তীব্র সমালোচনা করেন। মাদ্রিদকে ন্যাটোর একটি ‘ভয়ানক অংশীদার’ বলে অভিহিত করে তিনি ইরান যুদ্ধে সমর্থন না দেওয়ার জন্য মিত্রদের তুলোধুনো করেন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে স্পেনের সাথে সমস্ত বাণিজ্য বন্ধ করার জন্য মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টকে নির্দেশ দিয়েছেন। ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দেন, স্পেন একটি অর্থহীন বিষয় এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের সাথে আর কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক রাখতে চায় না। ন্যাটোতে তারা অংশগ্রহণ করে না এবং অর্থও দেয় না উল্লেখ করে ট্রাম্প স্পেন সফরসহ সমস্ত বাণিজ্য ছিন্ন করার ঘোষণা দেন।

স্পেনের সমাজতান্ত্রিক নেতৃত্ব বরাবরই সামরিক ব্যয় বাড়ানোর জন্য ট্রাম্পের দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে। এছাড়া ইরান যুদ্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের আকাশসীমা বা ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছে মাদ্রিদ। ট্রাম্পের এমন কড়া মন্তব্যের পর স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ জানিয়েছেন, ট্রাম্পের সাথে তার অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনা হয়েছে, যেখানে তারা ফুটবল বিশ্বকাপ এবং গলফ নিয়ে কথা বলেছেন, সামরিক ব্যয় নিয়ে নয়। তবে স্পেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মনিকা গার্সিয়া কড়া ভাষায় এক্সে (সাবেক টুইটার) বলেন, তারা একটি সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক দেশ এবং কূটনীতিকে হয়রানি বা বুলিংয়ের সাথে গুলিয়ে ফেলাটা অত্যন্ত ভয়ংকর।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইরান চুক্তি ‘মৃত’ ঘোষণা ও ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট মিসাইলের প্রতিশ্রুতি

ইউরোপে চরম অজনপ্রিয় ইরান যুদ্ধের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে কার্যত বাতিল বলে ঘোষণা দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনটি ট্যাংকারে হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ইরানে নতুন করে সামরিক হামলা চালিয়েছে এবং দেশটির তেল বিক্রির লাইসেন্স বাতিল করেছে। ইরানের সাথে অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিটি শেষ হয়ে গেছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, চুক্তিটি শেষ এবং তিনি তাদের সাথে আর কোনো আলোচনায় যেতে চান না। তিনি ইরানের নেতৃত্বকে ‘অসুস্থ’ মানুষ বলে তীব্র কটাক্ষ করেন।

অন্যদিকে, রাশিয়ার ভয়াবহ বিমান হামলা মোকাবেলায় ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষার ঘাটতি পূরণে কিয়েভকে প্যাট্রিয়ট মিসাইল তৈরির লাইসেন্স দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ট্রাম্প। গত বছর হোয়াইট হাউসে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে তীব্র ভর্ৎসনা করলেও, এবারের সম্মেলনে তার সাথে উষ্ণ বৈঠক করেছেন তিনি।

গ্রিনল্যান্ড দাবি ও ন্যাটোতে প্রতিক্রিয়া

ডেনমার্কের আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ আবারও দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যা স্নায়ুযুদ্ধের পর থেকে পশ্চিমা নিরাপত্তার ভিত্তি হিসেবে কাজ করা ন্যাটো জোটের মধ্যে তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে। ট্রাম্প দাবি করেন, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, ডেনমার্কের জন্য নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ডেনমার্ক যখন একদিনের মধ্যেই নাৎসিদের কাছে পরাজিত হয়, তখন তারা যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনল্যান্ডের দায়িত্ব নিতে বলেছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র তখন গ্রিনল্যান্ড নিয়েছিল এবং পরবর্তীতে ‘বোকামি করে’ তা ফেরত দিয়েছিল।

ট্রাম্পের এই দাবির কড়া জবাব দিয়েছেন ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের নেতারা। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়। গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডেরিক নিয়েলসেন ফেসবুকে লিখেছেন, বারবার তাদের দেশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আহ্বান জানালেই বাস্তবতা বদলে যাবে না এবং গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁও আশ্বস্ত করে বলেন, তিনি মনে করেন না যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড দখল করার চেষ্টা করবে। ন্যাটো জোটে একে অপরের ওপর আক্রমণ না করার নিয়মের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।

সম্মেলনের শেষে ঐক্যের বার্তা ও সহায়তার প্রতিশ্রুতি

শুরুতে আক্রমণাত্মক থাকলেও রুদ্ধদ্বার বৈঠক থেকে বেরিয়ে ট্রাম্প সম্পূর্ণ ভিন্ন সুরে কথা বলেন। তিনি জানান, ওই কক্ষে প্রচুর ভালোবাসা এবং ঐক্য ছিল। ন্যাটোতে থাকতে চাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মিত্রদের সাথেই থাকতে চায়। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ এবং ন্যাটো মহাসচিব রুট উভয়ই জানিয়েছেন, জোট আগের চেয়ে অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ। সম্মেলনে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো সম্মিলিত প্রতিরক্ষার (আর্টিকেল ৫) প্রতি তাদের ‘লৌহদৃঢ় প্রতিশ্রুতি’ পুনর্ব্যক্ত করে একটি ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছে। একইসাথে, ২০২৬ সালের জন্য ইউক্রেনকে ৭০ বিলিয়ন ইউরো (৮০ বিলিয়ন ডলার) সামরিক সহায়তা দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জোটের সদস্যরা।

সূত্র: রয়টার্স।