টানা বৃষ্টিতে তিন জেলায় ২২ জন নিহত
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের কারণে চট্টগ্রাম অঞ্চলে টানা চার দিন ধরে ভারী বৃষ্টিপাত চলছে। এই বৃষ্টির কারণে পাহাড়ধস ও দেয়ালচাপায় গত তিন দিনে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও রাঙামাটি জেলায় অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল বুধবার নিহতদের মধ্যে সাত শিশু রয়েছে।
কক্সবাজার শিবিরে মাদ্রাসার দেয়ালধসে পাঁচ শিশুর মৃত্যু
কক্সবাজারের উখিয়ার ৫ নম্বর রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে একটি মহিলা হেফজখানার (মাদ্রাসা) দেয়াল ও মাটি চাপা পড়ে পাঁচ ছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে চারজনের পরিচয় নিশ্চিত করেছেন ১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক ও অ্যাডিশনাল ডিআইজি সিরাজ আমিন। নিহতরা হলেন: রাশিদা বেগম (১৩), উন্মে নেজাতুল (১৩), উন্মে সালমা (১২) ও উমাইসা বিবি (১৩)।
গতকাল বেলা দুইটার দিকে ভারী বর্ষণে দেয়াল ধসে পড়লে এই দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার সময় মাদ্রাসাটিতে ৩০ জন শিশু ছিল। ফায়ার সার্ভিস, ক্যাম্প প্রশাসন, এপিবিএন ও রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবীরা উদ্ধার তৎপরতা চালান। সন্ধ্যায় উদ্ধারকাজ শেষ হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তিন শিশু-কিশোরীকে কুতুপালং ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, 'বিকেলে দুর্ঘটনাস্থল থেকে ৩০ শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচজন মারা গেছে। গুরুতর আহত অবস্থায় তিনজনকে কুতুপালং ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পাহাড়ের খাদে নির্মিত দেয়াল মাদ্রাসার ওপর ধসে পড়লে এ ঘটনা ঘটে।'
চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যু
চট্টগ্রামে পৃথক দুটি পাহাড়ধসের ঘটনায় দুই শিশু মারা গেছে। গতকাল সকাল নয়টায় জঙ্গল সলিমপুরের বাগানবাড়ির ৬ নম্বর সমাজ এলাকায় একটি পাহাড়ধসে ১০ মাস বয়সী আশরাফুল ইসলাম মারা যায়। শিশুটির মা লামিয়া আক্তার মাটিচাপা পড়ে আহত হন। দুপুরে নগরের চশমা হিলের মেয়র গলি এলাকায় পাহাড়ধসে সামিয়া ইসলাম (১৩) নামের আরেক শিশু মারা যায়।
চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা ও ট্রেন চলাচল বন্ধ
ভারী বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম নগরে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি জমেছিল। নগরের কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলা, বাদুড়তলা, পাঁচলাইশ, রেয়াজউদ্দিন বাজার, তিন পোলের মাথা, চান্দগাঁও, শমসেরপাড়া, খরমপাড়া, খাজা রোড, সুন্নিয়া মাদ্রাসা, আগ্রাবাদ, রামপুরা, হালিশহরসহ বিভিন্ন এলাকায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পানি জমে ছিল।
রেললাইনের ওপর পানি জমে থাকায় কক্সবাজারের সঙ্গে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। নগরের সুন্নিয়া মাদ্রাসা থেকে শমসেরপাড়া পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার রেলপথ দুই ফুট পানিতে ডুবে আছে। রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ গতকাল সকালে রেলপথ পরিদর্শন করে ভবিষ্যতে রেললাইন পাঁচ ফুট উঁচু করার ঘোষণা দেন।
রেলওয়ের পরিচালক (জনসংযোগ) আনিসুর রহমান বলেন, 'চট্টগ্রাম-কক্সবাজার পথে প্রতিদিন চার জোড়া ট্রেন চলাচল করে। এসব ট্রেনে করে প্রতিদিন প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। কবে নাগাদ ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হবে তা এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না।'
বৃষ্টিপাতের রেকর্ড ও বিশেষজ্ঞ মতামত
গতকাল বেলা তিনটা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৭৯ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। এর আগে গত মঙ্গলবার রেকর্ড পরিমাণ ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, যা ৪৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক অলক পাল বলেন, 'এবার আষাঢ়ের ১ থেকে ২০ তারিখ পর্যন্ত কোনো বৃষ্টি হয়নি। এখন অতি বৃষ্টির প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে সাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ। তবে গত ৪৩ বছরে এত ব্যাপক পরিমাণে বৃষ্টি হয়নি। সে হিসাবে এবারের বৃষ্টিকে অস্বাভাবিক বলা যায়।' তিনি আরও বলেন, 'দুর্যোগ মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর সমন্বয়হীনতা রয়েছে। বর্ষার শুরুতে দুর্যোগ মোকাবিলায় যে রকম প্রস্তুতি নেওয়া দরকার, প্রশাসন সেভাবে অনেক সময় নেয় না। শুরু থেকে সমন্বয় থাকলে অনেক প্রাণহানি কমানো যেত।'
আবহাওয়া ও ভূপ্রাকৃতিক কেন্দ্র চট্টগ্রামের উপপরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রহমান খান বলেন, 'ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশে এমনিতেই বর্ষাকালে বৃষ্টি হয়। এ সময়ে দেশের উপকূলে কিংবা উপকূল ঘেঁষে কোনো লঘুচাপ সৃষ্টি হলে প্রচুর পরিমাণ বৃষ্টি হয়। এবার সে রকম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।'
সাজেকে আটকা ৪৫০ পর্যটক
একটানা অতি ভারী বৃষ্টিতে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বেশ কিছু এলাকা পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে। রাঙামাটির সঙ্গে খাগড়াছড়ির সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। খাগড়াছড়ির দীঘিনালা-রাঙামাটির লংগদু-সাজেক সড়কও তলিয়ে গেছে। ফলে সাজেকে অবস্থানরত সাড়ে ৪০০ পর্যটক আটকা পড়েছেন।
সাজেক কটেজ অ্যান্ড রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুপর্ণ দেব বর্মণ বলেন, 'পর্যটকদের সাজেক ভ্যালিতে বুধবার দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করার অনুরোধ করা হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে এবং যাতায়াতের পরিবেশ তৈরি হলে বিকেলে সেনাবাহিনীর সহায়তায় খাগড়াছড়ি সদরে ফিরিয়ে আনা হতে পারে।'
পাঁচ জেলায় প্লাবিত এলাকা
চার দিনের টানা অতি ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। চট্টগ্রামের আট উপজেলাসহ বিভিন্ন জেলায় হাজারো পরিবার পানিবন্দী। কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরীতে অন্তত ১৫ হাজার পরিবার বন্যাকবলিত। পাহাড়ধস, ভাঙন ও জলাবদ্ধতায় সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ–বিচ্ছিন্ন অবস্থা বিরাজ করছে এবং ফসল ও মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রশাসন আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে আহ্বান জানিয়েছে।



