ইরান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নীতিগত মতভেদের মধ্যেই চলতি সপ্তাহে বেইজিং সফরে যাচ্ছেন সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে বিশ্বের শীর্ষ তেল রফতানিকারক দেশ সৌদি আরবের তেল পরিবহন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে, এমন সময়েই এই সফরের ঘোষণা এলো।
চীনের আমন্ত্রণে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে জানিয়েছে, চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর আমন্ত্রণে মঙ্গলবার থেকে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই দুই দিনের সফর শুরু হবে। তবে সফরের বিস্তারিত আলোচ্যসূচি প্রকাশ করা হয়নি। সৌদি আরবও এখন পর্যন্ত এই সফরের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও মন্তব্য করেনি।
চীনের মধ্যপ্রাচ্য কূটনীতি
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের জন্য চীন বেশ কয়েক বছর ধরে চেষ্টা চালাচ্ছে। এই সফরের মাধ্যমে চীন মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব আরও গভীর করতে চায়। গত ৮ মার্চ চীনের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ দূত ঝাই জুন ইরান যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতার অংশ হিসেবে সৌদি আরব সফর করেছিলেন। এর আগে ২০২৩ সালের মার্চে চীনের মধ্যস্থতাতেই রিয়াদ ও তেহরানের মধ্যে এক ঐতিহাসিক পুনর্মিলন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।
সৌদি-মার্কিন মতভেদ
চলমান ইরান যুদ্ধে সৌদি আরব শুরু থেকেই উত্তেজনা হ্রাসের আহ্বান জানিয়ে আসছে এবং এই ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে রিয়াদের এক ধরনের বিরোধ তৈরি হয়েছে। গত মে মাসে নিউ ইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে জানায়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার মার্কিন নৌ অভিযান প্রজেক্ট ফ্রিডম-এর জন্য নিজেদের সামরিক ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহার করতে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে সৌদি আরব। এছাড়া গত সপ্তাহে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, উপসাগরীয় দেশ ও ইরানের মধ্যে একটি পুনর্মিলন বৈঠকের আয়োজন করার পরিকল্পনা করছে সৌদি রাজপরিবার।
তেল বাণিজ্যে প্রভাব
ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে, যার ফলে তেলের দামও বেড়েছে। অর্থনৈতিকভাবে সৌদি আরব চীনের অন্যতম বৃহৎ অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী দেশ। ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড সেন্টারের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীন সৌদি আরব থেকে প্রায় ৭ কোটি ৮০ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছিল, যা চীনের মোট তেল আমদানির প্রায় ১৪ শতাংশ।
তবে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের গত ১১ জুনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর আগে চীন যেখানে প্রতি মাসে সৌদির সরকারি কোম্পানি আরামকো থেকে ৪ থেকে ৫ কোটি ব্যারেল তেল আমদানি করত, সেখানে আগামী জুলাইয়ে তা রেকর্ড সর্বনিম্ন প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেলে নেমে আসতে পারে। মে মাসে এই আমদানির পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ থেকে ২ কোটি ব্যারেল এবং জুনে ছিল ১ কোটি ৩০ লাখ থেকে ১ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেল।
ইরানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক
অন্যদিকে চীন ইরানেরও একটি প্রধান অংশীদার এবং ইরানি তেলের বিশ্বের শীর্ষ ক্রেতা। ইউএস-চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড সিকিউরিটি রিভিউ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের মোট তেল বিক্রির প্রায় ৯০ শতাংশই যায় চীনে। চলমান এই সংঘাতের শুরু থেকেই চীন প্রকাশ্যে সংযম এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানিয়ে আসছে, একই সঙ্গে তেহরানের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্কও বজায় রাখছে।
সাম্প্রতিক হামলা ও কূটনৈতিক উদ্যোগ
সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরটি এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) কুয়েতের আলী আল সালেম বিমান ঘাঁটিতে থাকা আটটি মার্কিন সামরিক স্থাপনা এবং বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সঙ্গে যুক্ত স্থাপনাগুলোতে একঝাঁক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের দুটি হামলার পর, গত রবিবার মার্কিন বিমানবাহিনী ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন গুদাম এবং উপকূলীয় রাডার স্টেশনগুলোতে পাল্টা হামলা চালায়।
এই পাল্টাপাল্টি হামলা গত ১৭ জুন তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। তবে সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে এক পোস্টে জানিয়েছেন, তেহরানের অনুরোধে মঙ্গলবার কাতারের রাজধানী দোহায় ইরানের সঙ্গে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
যুদ্ধের প্রভাব ও সৌদির প্রতিরক্ষা
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান তার প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোতে শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক সম্পদের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহগুলোতে সৌদির বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী অন্তত ৪৩৮টি ড্রোন এবং ৩৬টি ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। সৌদির বেশিরভাগ তেল স্থাপনা সমৃদ্ধ পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটিই ছিল এই ড্রোন হামলাগুলোর প্রধান লক্ষ্য।



