প্রধানমন্ত্রীর চীন-মালয়েশিয়া সফর: কূটনীতি ও অর্থনীতির যুগান্তকারী সাফল্য
প্রধানমন্ত্রীর চীন-মালয়েশিয়া সফর: কূটনীতি ও অর্থনীতির সাফল্য

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন ও মালয়েশিয়া সফর বাংলাদেশের কূটনীতি ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই দ্বৈত সফর 'সবার আগে বাংলাদেশ' নীতি ও সমতা ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছে। পররাষ্ট্রনীতিতে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার 'বিদেশে আমাদের বন্ধু আছে, প্রভু নেই' এই বক্তব্যের প্রতিফলন সফরের প্রতিটি পদক্ষেপে দেখা গেছে। বাংলাদেশ এখন আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।

মালয়েশিয়া সফর: মুক্তবাণিজ্য ও জনশক্তি

মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রাজায়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে লালগালিচা সংবর্ধনা ও রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার প্রদান করেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। দুই নেতার বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন অধ্যায় সূচিত হয়। শ্রমবাজার আধুনিকায়ন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতা আলোচনায় প্রাধান্য পায়।

সফরের প্রধান সাফল্য হলো মুক্তবাণিজ্য চুক্তি, যার ফলে মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ ও কৃষিপণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। রপ্তানি ২০-৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে বার্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি কমবে ৫০০ থেকে ৭০০ মিলিয়ন ডলার, যা ৬,০০০ থেকে ৮,৪০০ কোটি টাকার সমান।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শ্রমবাজার আধুনিকায়নে ৩৩ দফার যৌথ ঘোষণা এসেছে, যা সিন্ডিকেট ভাঙতে ভূমিকা রাখবে। সেমি-কন্ডাক্টর, আইটি ও হেলথকেয়ারে দক্ষ কর্মী পাঠানো শুরু হলে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও ১ থেকে ১.৫ বিলিয়ন ডলার (১২,০০০-১৮,০০০ কোটি টাকা) বৃদ্ধি পাবে।

মালয়েশিয়ায় বিনিয়োগ ও হালাল বাজার

পেট্রোনাস, আজিয়াটা ও এয়ারএশিয়ার শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হয়েছে। ব্যবসায়িক চেম্বারগুলোর প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী ২-৩ বছরে মালয়েশিয়া থেকে ৩০০-৫০০ মিলিয়ন ডলার সরাসরি বিনিয়োগ আসতে পারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মালয়েশিয়ার হালাল সার্টিফিকেশন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, কসমেটিকস ও ওয়ান-টাইম ইউজ পণ্যের জন্য বৈশ্বিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের হালাল বাজারের দরজা খুলেছে। প্রাথমিক অবস্থায় বছরে অন্তত ১০০ মিলিয়ন ডলারের নতুন রপ্তানি বাজার তৈরি সম্ভব।

চীন সফর: কৌশলগত অংশীদারত্ব

মালয়েশিয়া সফরের পর প্রধানমন্ত্রী দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নেন এবং ফোরামের প্রেসিডেন্ট আলোইস জুইংগির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বেইজিংয়ে পৌঁছাতে তিনি বুলেট ট্রেনে ভ্রমণ করেন এবং চাউমিং রেলস্টেশনে লালগালিচা সংবর্ধনা পান।

গ্রেট হল অব পিপলে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং ও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সফরে ২টি চুক্তি ও ১৩টি সমঝোতা স্মারকসহ মোট ১৭টি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশ প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের উন্নয়ন সহায়তা, রেয়াতি ঋণ ও অনুদান আশা করছে।

অবকাঠামো ও বিনিয়োগ

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলে বড় অগ্রগতি হয়েছে। প্রস্তুত হলে প্রাথমিক ধাপে সেখানে ন্যূনতম ৫০০ মিলিয়ন ডলার চীনা বিনিয়োগ আসবে। বেইজিংয়ে 'বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরামে' প্রধানমন্ত্রী প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন এবং চীনে বাংলাদেশের প্রথম বিনিয়োগ কার্যালয় স্থাপনের ঘোষণা দেন।

থমকে থাকা মেগা প্রকল্পের অর্থায়ন জটিলতা দূর করা হয়েছে: মোংলা সমুদ্রবন্দর আধুনিকায়নে ৪০০ মিলিয়ন ডলার, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশনের অধীনে ১.৪ বিলিয়ন ডলারের বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক প্রকল্প, এবং পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির ৯৬৬ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্পে চীনা এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়ন সচল হয়েছে।

বাণিজ্য ঘাটতি ও তিস্তা প্রকল্প

বার্ষিক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ২২-২৫ বিলিয়ন ডলার। নতুন সমঝোতা অনুযায়ী কৃষিপণ্য ও ওষুধ রপ্তানি শুরু হলে বাণিজ্য ঘাটতি ২-৩ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব, যা প্রতি বছর ৫০০-৭০০ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করবে। তিস্তা বৃহদায়তন প্রকল্পে চীনের সহযোগিতার আশ্বাস মিলেছে এবং চীনের জিডিআই-এ বাংলাদেশের যুক্ততা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

মিডিয়া, কৃষি ও রাজনৈতিক সহযোগিতা

সংবাদ ও তথ্য বিনিময়ে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা, গণমাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব, গ্লোবাল সাউথভুক্ত গণমাধ্যমে যৌথ গবেষণা, প্রযুক্তি ও সম্প্রচার সহযোগিতার সুযোগ সম্প্রসারিত হবে। কৃষি প্রযুক্তি, রাস্তাঘাট উন্নয়ন ও শিক্ষা খাতে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।

চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ও বিএনপির মধ্যে সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা হয় এবং প্রধানমন্ত্রী চীনা কমিউনিস্ট পার্টির জাদুঘর পরিদর্শন করেন। সিপিসির আন্তর্জাতিক বিভাগের প্রধান লিউ হাইসিং, সিডকার চেয়ারম্যান চেন শিয়াওডং ও চায়না এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান চেন হুয়াইউ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রকল্পে অর্থায়নের আশ্বাস দেন।

ভূরাজনীতি ও সামরিক সহযোগিতা

বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত ইকোনমিক করিডর তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীকে আধুনিকায়নে চীন থেকে ২৪টি জে-১০সিই মাল্টিরোল ফাইটার জেট কেনার আলোচনা ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

সার্বিকভাবে, মালয়েশিয়া সফর তাৎক্ষণিক রেমিট্যান্স ও জনশক্তির ক্ষেত্র তৈরি করেছে, আর চীন সফর দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়ন ও মেগা প্রকল্প ফান্ডিং নিশ্চিত করেছে। সফরের সফল বাস্তবায়ন দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৪২,০০০ থেকে ৪৫,০০০ কোটি টাকার আর্থিক ও বাণিজ্যিক গতিশীলতা আনবে।