ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। মেকারফিল্ড উপনির্বাচনে অ্যান্ডি বার্নহামের বিশাল জয়ের পর দল ও মন্ত্রিসভায় তাঁর ওপর থেকে সমর্থন পুরোপুরি চলে যায়। গত সপ্তাহের শেষে ব্যক্তিগত আলোচনায় এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তবে নিজের বিদায়ী পরিকল্পনা এমনভাবে সাজিয়েছেন, যাতে কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ও লিজ ট্রাসের মতো গণপদত্যাগের মুখে পড়ে তাঁকে বিদায় নিতে না হয়।
পদত্যাগের পটভূমি
স্টারমারের পদত্যাগের তাৎক্ষণিক কারণ ছিল দল এবং মন্ত্রিসভায় তাঁর ওপর থেকে সমর্থন পুরোপুরি চলে যাওয়া। সব মিলিয়ে লক্ষ্যটি ছিল পূর্ববর্তী কনজারভেটিভ সরকারের চেয়ে একটু ভালোভাবে—সুনামের সঙ্গে—ক্ষমতার হস্তান্তর নিশ্চিত করা। তা সত্ত্বেও, সর্বোচ্চ পদে থাকার দিনগুলো নিয়ে তাঁর আবেগঘন বক্তব্য একজন ব্যর্থ নেতারই প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলে।
জনপ্রিয়তার চিত্র
১০ ডাউনিং স্ট্রিটে পা রাখার আগের দিনও স্টারমার খুব একটা জনপ্রিয় ছিলেন না। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে ইপসসের জরিপে তাঁর জনপ্রিয়তার রেটিং ছিল মাইনাস ২১। ক্ষমতা গ্রহণ করতে যাওয়া কোনো প্রধানমন্ত্রীর জন্য এটি ছিল ইতিহাসের সর্বনিম্ন রেটিং। সে সময় মাত্র ৩১ শতাংশ মানুষ তাঁর কার্যকলাপে সন্তুষ্ট ছিলেন, আর ৫২ শতাংশ ছিলেন অসন্তুষ্ট। ইতিহাসে তিনিই প্রথম নেতা যিনি এত নেতিবাচক রেটিং নিয়েও সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিলেন।
অবশ্য ব্রেক্সিট গণভোটের পর থেকে ব্রিটেনের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এমন পরিসংখ্যান খুব একটা অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। ইউগভের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণার শুরুতে স্টারমারের পূর্বসূরি ঋষি সুনাকের রেটিং ছিল মাইনাস ৫৬।
ক্ষমতার অস্থিরতা
গত এক দশকে ষষ্ঠ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি পদত্যাগ করলেন। এর মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ রাজনীতিতে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিক থেকে তাঁর অবস্থানকে অভেদ্য মনে হচ্ছিল, কিন্তু বরিস জনসনের ক্ষেত্রেও ঠিক একই কথা বলা হয়েছিল। ২০১৯ সালের নির্বাচনের পর ভাবা হয়েছিল কনজারভেটিভরা আগামী এক দশক আধিপত্য ধরে রাখবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, তিন বছরের মাথায় জনসন বিদায় নিলেন এবং এখন কনজারভেটিভদের অস্তিত্বসংকটের কথা আলোচনা হচ্ছে।
লেবার পার্টির সংকট
স্টারমারের ভুলটা কোথায় ছিল? পরিহাসের বিষয় হলো, এর উত্তর লুকিয়ে আছে তাঁর আগের লেবার নেতা জেরেমি করবিনের ভাগ্যের মধ্যে। করবিনের রেকর্ড এখন স্টারমারের মতোই দেখাচ্ছে। ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে করবিনের ব্যক্তিগত রেটিং ২০১৭ সালের নির্বাচনী প্রচারণার মাইনাস ১১ থেকে নেমে ২০১৯ সালের পরাজয়ের সময় মাইনাস ৪৪-এ গিয়ে ঠেকেছিল। তখন ব্রেক্সিট ইস্যুতে করবিনের ধরি মাছ না ছুঁই পানি নীতি ভেস্তে যায়।
স্টারমারের উত্থান ও পতনও ঠিক সমপরিমাণ সময়ের মধ্যেই ঘটল। আর এর পেছনের কারণগুলো লেবার পার্টির দুই শিবিরের জন্যই স্বীকার করা বেশ অস্বস্তিকর। ২০১৭-১৯ এবং ২০২২-২৪ উভয় সময়েই লেবার পার্টির এই ক্ষণস্থায়ী লিড মূলত বিরোধী দলের প্রতি জনগণের ভালোবাসার কারণে আসেনি, বরং তা এসেছিল ক্ষমতাসীন সরকারের চরম ব্যর্থতার ফলে। ২০২৪ সালের ‘নিস্পৃহ ভূমিধস’ জয়ের তথ্যই প্রমাণ করে, লেবার পার্টি মাত্র ৩৪ শতাংশ ভোট পেয়ে দেশের ৬৪ শতাংশ আসন জিতেছিল—যা ইতিহাসে যেকোনো সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারের জন্য সর্বনিম্ন ভোটের রেকর্ড।
ব্রেক্সিটের প্রভাব
খুবই প্রাসঙ্গিকভাবে, এই পদত্যাগের ঘটনাটি ঘটল ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটের ঠিক ১০ বছর পূর্তির কাছাকাছি সময়ে। এটা নিশ্চিত যে ব্রেক্সিটকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিভাজনগুলো এখনো ব্রিটিশ রাজনীতির মূলে রয়ে গেছে—যদিও অনেকে হয়তো সেই বিতর্কের খুঁটিনাটি ভুলে গেছেন।
অধ্যাপক টিম বেল সম্প্রতি যেমনটা যুক্তি দিয়েছেন, ব্রিটিশ রাজনীতিকে দুটি ব্লকের মেরুকরণ হিসেবে দেখাই সবচেয়ে শ্রেয়। ভোটাররা মূলত পরিচয়ভিত্তিক দুটি শিবিরে বিভক্ত এবং ব্রেক্সিট নিয়ে তাঁদের অবস্থানই এর মূল ভিত্তি। তবে এই বাস্তবতা মাঝেমধ্যে আড়ালে পড়ে যায়, কারণ এই ব্লকগুলো ভেতর থেকে খণ্ড–বিখণ্ড এবং খুব কম সময়ই তারা সরাসরি মূল সমস্যাটি নিয়ে কথা বলে।
জনগণ হয়তো সাময়িকভাবে কোনো সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে একজোট হতে পারে, কিন্তু নীতির অন্যান্য প্রশ্নে তারা গভীরভাবে বিভক্তই থেকে যায়। ফলে স্টারমার (কিংবা করবিন) এর মতো নেতারা মূলত বালুর তৈরি একটি দুর্গের ওপর দাঁড়িয়ে জোট ধরে রাখার চেষ্টা করেন, যা জোয়ারের পানি আসার সঙ্গে সঙ্গেই ভেঙে পড়ে।
উপসংহার
নিকোলাস ডিকিনসন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক, ইউনিভার্সিটি অব এক্সিটার। দি কনভারসেশন থেকে অনূদিত।



