ছোট্ট একটি পড়ার টেবিল। তার ওপর ঠাসাঠাসি করে রাখা বই। বইয়ের ফাঁকে পড়ে আছে একটি ল্যাপটপ ও মাউস। পাশে খাটের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কিছু পোশাক। ছোট্ট এ কক্ষটিতে থাকতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শহীদুল ইসলাম। তবে তিনি আর এ ঘরে ফিরবেন না। তিন দিন নিখোঁজ থাকার পর গত মঙ্গলবার সাগরের উপকূল থেকে তাঁর অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার হয়েছে। তাঁর সেই মৃত্যুর রহস্যের উত্তর খুঁজছে পরিবার।
পারিবারিক পটভূমি
শহীদুল আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনিই সবার ছোট। তাঁর এক বোন ফ্রান্স ও এক বোন অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন। আর এক বোন স্থানীয় একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক। বাবা শফিকুল আলম একটি ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা। প্রায় ২৫ বছর আগে তিনি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। পরিবারটির আদি বাড়ি সন্দ্বীপের কাচিয়াপাড়া ইউনিয়নে। তবে প্রায় তিন দশক আগে তাঁরা চট্টগ্রাম নগরে চলে আসেন। এক দশক ধরে চট্টগ্রাম নগরের পাহাড়তলী এলাকার গ্রিনভিউ আবাসিক এলাকার একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন।
গত বুধবার তাঁদের ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখা যায়, শহীদুলের মৃত্যুর খবর যেন এখনো মেনে নিতে পারছেন না কেউ। পরিবারের সবাই এখনো শোকে স্তব্ধ। শহীদুলের মৃত্যুর খবর শুনে ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত মা রাজধনবিয়া (৬৮) জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। এখনো তিনি বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত বাবা শফিকুল আলম (৮৫) প্রায় বাক্রুদ্ধ হয়ে স্ত্রীর পাশে বসে আছেন।
নিখোঁজ ও লাশ উদ্ধার
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত শুক্রবার বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন শহীদুল। এরপর আর তাঁর খোঁজ পাওয়া যায়নি। তিন দিন নিখোঁজ থাকার পর সোমবার রাতে সীতাকুণ্ড উপজেলার সোনাইছড়ি ইউনিয়নের ঘোড়ামরা সমুদ্র উপকূল থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার হয়। তবে লাশটি যে শহীদুলের তা পরিবার জানতে পারে মঙ্গলবার। ওই দিন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে গিয়ে পরিবারের সদস্যরা শহীদুলের লাশ শনাক্ত করেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, চিকিৎসকদের পরামর্শে মা-বাবার সামনে শহীদুলের প্রসঙ্গ তোলা হচ্ছে না। আত্মীয়স্বজন এসে খোঁজখবর নিলেও প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলছেন পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে। ওই আবাসিক ভবনের দারোয়ান জসীম উদ্দীন বলেন, ‘পাঁচ বছর ধরে এই বাসায় চাকরি করি। শহীদুলকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। খুবই ভদ্র ছেলে ছিল। অযথা আড্ডা দিতে দেখিনি। বাসা থেকে বের হতো, আবার ফিরে আসত। কারও সঙ্গে কোনো ঝামেলার কথা কখনো শুনিনি।’
ভাইয়ের স্মৃতিচারণ
বাসার একটি ম্যাট্রেসের দিকে তাকিয়ে স্মৃতিচারণা করছিলেন শহীদুলের বড় ভাই জাহিদুল আলম। তিনি বলেন, ‘আমার ভাই খাটে ঘুমাতে পারত না। ছোটবেলা থেকেই মেঝেতে ম্যাট্রেস বিছিয়ে ঘুমানোর অভ্যাস ছিল। নিজের ঘরে পড়াশোনা করত, আর এখানে ঘুমাত। দু-তিন বছর আগে মা-বাবা দুজনই ক্যানসারে আক্রান্ত হন। হাসপাতালে আনা-নেওয়া, চিকিৎসার নানা কাজ শহীদুলই করত। এতে তার পড়াশোনারও ক্ষতি হয়েছে। এরপরও সে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল।’
মৃত্যুর রহস্য
শহীদুলের মামাতো ভাই মোক্তাদের মাওলা জানান, গত সোমবার রাতে সীতাকুণ্ড থেকে শহীদুলের লাশটি উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। পরদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে পরনের পোশাক দেখে তাঁর সন্দেহ হয়। পরে নিখোঁজ হওয়ার দিনের সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে পরিবারের সদস্যরা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে গিয়ে লাশ শনাক্ত করেন।
মোক্তাদের বলেন, ‘শুক্রবার (১২ জুন) বেলা ৩টা ৮ মিনিটে শহীদুল বাসা থেকে বের হন। সেদিন বৃষ্টির কারণে রাস্তায় পানি জমে ছিল। সিসিটিভিতে দেখা যায়, বের হয়ে কিছুক্ষণ সে সড়কে দাঁড়িয়ে ছিল। পরে পুলিশ মোবাইল ফোন ট্র্যাক করে জানতে পারে, বিকেল চারটার দিকে সে নগরের প্রাণ হরিদাস রোড এলাকায় ছিল। এরপর তার মোবাইল ফোন বন্ধ হয়ে যায়।’ আমাদের প্রশ্ন হলো, প্রাণ হরিদাস রোড থেকে সে সাগরে কীভাবে গেল? তার মৃত্যু কীভাবে হলো? এটি দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা নাকি অন্য কিছু—আমরা তা জানতে চাই।’
জানতে চাইলে কুমিরা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল ওয়াহেদ বলেন, ঘটনাটির তদন্ত তাঁরা কাজ করছেন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এখনো হাতে আসেনি। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা তাঁরা নেবেন।



