চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন কলেজছাত্রী সুমাইয়া জান্নাত (২০)। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে চুনতি বাজার এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে ইম্পিরিয়াল পরিবহন ও পূরবী পরিবহনের দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে লোহাগাড়া ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
হোস্টেলের সিট বরাদ্দের দিনেই দুর্ঘটনা
সুমাইয়া জান্নাত চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার পরিবার জানায়, ওই দিনই কলেজের হোস্টেলে তার সিট বরাদ্দ দেওয়ার কথা ছিল। নোটিশে অভিভাবকদের উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এ জন্য বাবা আরিফুর রহমান রাঙ্গুনিয়া থেকে এবং সুমাইয়া কক্সবাজারের চকরিয়ার মালুমঘাট এলাকার নানাবাড়ি থেকে কলেজের উদ্দেশে রওনা হন।
শেষ ফোনালাপ ও মর্মান্তিক সংবাদ
পথে বাবা আরিফুর রহমান মেয়েকে ফোন করে তার অবস্থান জানতে চান। অচেনা এক তরুণ ফোন ধরে জানান, মুঠোফোনের মালিক বেঁচে নেই। লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন আরিফুর। তিনি বলেন, ‘আমার মাথায় তখন আকাশ ভেঙে পড়ল। কী শুনলাম আমি। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময়ও তো সুমাইয়ার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। তারপর শুনলাম এই খবর। আমি অসুস্থ মানুষ। এই শোক কীভাবে বইব? মেয়ে স্বপ্ন দেখত, পড়াশোনা শেষ করে চাকরি নিয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়াবে, কিন্তু মেয়েটিই এখন নেই। এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না।’
মায়ের আহাজারি ও আক্ষেপ
সুমাইয়ার মা ইয়াছমিন আক্তার মেয়ের লাশের সামনে আহাজারি করতে করতে বলেন, ‘কলেজের হোস্টেলে আজ সিট বরাদ্দ দেওয়ার কথা ছিল। নোটিশ দিয়ে জানানো হয়েছিল, অভিভাবক নিয়ে যেতে হবে। এ জন্য সুমাইয়ার বাবা রাঙ্গুনিয়া থেকে কলেজে আসছিলেন। তিনি অপেক্ষা করবেন বলে মেয়েটি সকাল সাতটায় ভাত খেয়ে তাড়াহুড়া করে বাড়ি থেকে বের গেল। যাওয়ার সময় বলেছিলাম, এত তাড়া কিসের? পাঁচ মিনিট পর বের হও, কিন্তু মেয়ে কথা শোনেনি।’ তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘পাঁচ মিনিট পর বের হলে হয়তো আমার মেয়েটা বেঁচে যেত।’
দুর্ঘটনার বিবরণ
প্রত্যক্ষদর্শী ও হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা যায়, লোহাগাড়ার চুনতি বাজার এলাকায় কক্সবাজারগামী ইম্পিরিয়াল পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে চট্টগ্রামগামী পূরবী পরিবহনের আরেকটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে বাস দুটির সামনের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কয়েকজন যাত্রী আহত হন। সুমাইয়া জান্নাত গুরুতর আহত হন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
পুলিশি ব্যবস্থা ও আইনি পদক্ষেপ
দোহাজারী হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাহ উদ্দিন চৌধুরী প্রথম আলোকে জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং দুর্ঘটনাকবলিত বাস দুটি জব্দ করে। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কলেজছাত্রীর লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ঘটনার পরপরই দুই বাসের চালক পালিয়ে গেছেন। এ ঘটনায় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
পরিবারের পরিচিতি
সুমাইয়ার বাড়ি বাঁশখালী উপজেলার পুঁইছড়ি ইউনিয়নের আরব শাহ ঘোনাপাড়া জমিদারবাড়ি এলাকায়। বাবা আরিফুর রহমান পেশায় মসজিদের ইমাম। মা ও ভাইবোনদের নিয়ে সুমাইয়ারা থাকতেন কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার মালুমঘাট এলাকায় নানার বাড়িতে। বাবা কাজের সূত্রে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় থাকেন। তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সুমাইয়া সবার বড়।



