বিএনপির স্মার্ট কূটনীতি: চীন-মালয়েশিয়া সফর বিশ্লেষণ
বিএনপির স্মার্ট কূটনীতি: চীন-মালয়েশিয়া সফর

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর মালয়েশিয়া ও চীনকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক বিশ্লেষণ করেছেন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান। তাঁর মতে, প্রথম দেশ হিসেবে মালয়েশিয়া বেছে নেওয়া একটি ‘স্মার্ট ডিপ্লোমেটিক মুভ’। মালয়েশিয়ার জোটনিরপেক্ষ ভাব, আসিয়ান ও ওআইসিতে প্রভাবশালী অবস্থান এবং অর্থনৈতিক গুরুত্ব—এসব বিবেচনায় এটি বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক।

মালয়েশিয়া সফরের কূটনৈতিক তাৎপর্য

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচনের পর প্রথম বিদেশ সফর গুরুত্বপূর্ণ। মালয়েশিয়া বেছে নেওয়ার মাধ্যমে নতুন সরকার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির বার্তা দিয়েছে। মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের ৬ থেকে ৯ শতাংশ আসে। এছাড়া রোহিঙ্গা ইস্যুতে মালয়েশিয়া আন্তর্জাতিক ফোরামে শক্তিশালী অবস্থান নেয়। ফলে এই সফর রোহিঙ্গা সংকটে কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

চীন সফর: ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও নতুন সম্ভাবনা

চীন সফরে প্রধানমন্ত্রী লালগালিচা সংবর্ধনা পান এবং একাধিক সমঝোতা স্মারক সই হয়। তানজীমউদ্দিন খান বলেন, বিএনপির সঙ্গে চীনের ঐতিহ্যগত সুসম্পর্ক ছিল, কিন্তু ২০০৪ সালে ঢাকায় তাইওয়ানের অফিস খোলার পর তা চিড় ধরে। এখন চীন অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে বিএনপির সঙ্গে দূরত্ব ঘোচাতে আগ্রহী। বিএনপির জন্যও এটি চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বর্তমানে বাংলাদেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বড় অংশ অবকাঠামোতে বরাদ্দ। চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের ঢাকা সফরে ২০ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, যার আওতায় পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা রেলসেতু, কর্ণফুলী টানেলের মতো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি ও চীন-ভারত সমীকরণ

বাংলাদেশ সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বিতর্কিত বাণিজ্যচুক্তি সই করেছে। তানজীমউদ্দিন খান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন ‘ইকোনমিক ন্যাশনালিজম’ বা ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি অনুসরণ করছে। এই চুক্তি পুনর্বিবেচনার প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। চীনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা চাপ মোকাবিলা করা সম্ভব। মালয়েশিয়ার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, তারা নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেও অর্থনীতিতে চীনের ওপর নির্ভর করে।

ভারতের ক্ষেত্রে, চীনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে ভারতের বিজেপি সরকারের পরিচয়বাদী রাজনীতি এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত নতুন হাইকমিশনার (একজন রাজনীতিবিদ) দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়াতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ভারত সফরে অকূটনৈতিক আচরণের শিকার হয়েছেন, যা ভালো ইঙ্গিত নয়।

চীনের পাবলিক ডিপ্লোমেসি ও রোহিঙ্গা সংকট

গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব চীনকে পাবলিক ডিপ্লোমেসি জোরদার করতে উৎসাহিত করছে। চীন এখন ‘ইন্টারডিপেনডেন্ট হেজিমনি’ তত্ত্ব প্রচার করছে, যা বহুমেরু বিশ্বের ধারণা দেয়।

রোহিঙ্গা সংকটে চীনের ভূমিকা নিয়ে তানজীমউদ্দিন খান হতাশাবাদী। চীনের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি অর্থনৈতিক স্বার্থ। মিয়ানমারের রাখাইনে চীনের বিশাল বিনিয়োগ থাকায় তারা মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নেয়। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদেও চীন মিয়ানমারের পক্ষে ভোট দেয়। তাই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের কাছ থেকে অলৌকিক কিছু আশা করা কঠিন।

চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর

চীন তাদের বিআরআই-এর অংশ হিসেবে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর পুনরুজ্জীবিত করতে চায়। এর লক্ষ্য চীনের ইউনান প্রদেশকে মোংলা ও চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করা। ভারত মালাক্কা প্রণালি ও ভারত মহাসাগরে চীনের নজরদারি করায় চীন বিকল্প পথ হিসেবে এই করিডর ব্যবহার করে বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করতে চায়।