বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদার করতে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার (৮ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে মাদক চোরাচালান প্রতিরোধ, আধুনিক নগর নিরাপত্তা, পুলিশ বাহিনীর প্রশিক্ষণ এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
বৈঠকে নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ
বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। পাকিস্তানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন দেশটির ইন্টেরিয়র ও মাদক নিয়ন্ত্রণবিষয়ক মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন নাকভী। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা (উপপ্রধান তথ্য অফিসার/পরিচালক) ফয়সল হাসান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
আলোচিত বিষয়
বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা সহযোগিতা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, মাদক চোরাচালান প্রতিরোধ, আধুনিক নগর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আলোচনার শুরুতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ চলতি বছরের মে মাসে পাকিস্তানের ইন্টেরিয়র মন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ওই সফরের ধারাবাহিকতায় মাদকদ্রব্য ও সাইকোট্রপিক উপাদানের অবৈধ পাচার এবং অপব্যবহার রোধে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সীমান্ত নিরাপত্তা ও সমাজকে সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
তিনি দুই দেশের অভিন্ন ইতিহাস, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ ১৪ বছর পর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ঢাকা-করাচি রুটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সরাসরি ফ্লাইট পুনরায় চালু হওয়ায় দুই দেশের জনগণের যোগাযোগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিকদের সংকট
বৈঠকে পাকিস্তানে বসবাসরত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিকদের মানবিক সংকটের বিষয়টিও তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় পারিবারিক নথিপত্র (ফ্যামিলি ট্রি) না থাকায় অনেক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পাকিস্তানি নাগরিক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা দেশটির কম্পিউটারাইজড ন্যাশনাল আইডেন্টিটি কার্ড (সিএনআইসি) পেতে জটিলতায় পড়ছেন। এর ফলে তারা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাসহ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিষয়টির মানবিক সমাধানে পাকিস্তান সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
নগর নিরাপত্তায় ‘সেফ সিটি’ প্রকল্প
নগর নিরাপত্তায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পাকিস্তানের ‘সেফ সিটি’ প্রকল্পের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, দেশটির ৪০টিরও বেশি শহরে বাস্তবায়িত এ উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্যও অনুসরণযোগ্য হতে পারে। এ ক্ষেত্রে কারিগরি ও কৌশলগত সহযোগিতা দিতে পাকিস্তানের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সিনিয়র সচিব, বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব, ইসলামাবাদ, লাহোর, মুলতান ও করাচির ‘সেফ সিটি’ মডেল পরিদর্শন করেছেন। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের শহরগুলোকে আরও নিরাপদ করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
পুলিশ প্রশিক্ষণ ও রোহিঙ্গা সংকট
এ সময় বাংলাদেশ পুলিশের পেশাগত দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে উচ্চতর প্রশিক্ষণ প্রদানে পাকিস্তানের সহযোগিতাও চান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনায় তিনি বলেন, অতীতে সৌদি আরবে অবস্থানরত অনিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের বিষয়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সমন্বিতভাবে কাজ করেছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় দুই দেশের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, মিয়ানমার যেন তাদের নাগরিকদের দ্রুত, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই উপায়ে ফিরিয়ে নেয়, সে লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের ধারাবাহিক সমর্থন প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ।
সফরের আমন্ত্রণ ও উপসংহার
বৈঠকের একপর্যায়ে পাকিস্তানের ইন্টেরিয়র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে পাকিস্তান সফরের আমন্ত্রণ জানান। আমন্ত্রণের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুবিধাজনক সময়ে দেশটি সফরের আগ্রহ প্রকাশ করেন। বৈঠকে দুই দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।



