ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক হোক সম্মানের ভিত্তিতে: বিশ্লেষক
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক হোক সম্মানের ভিত্তিতে

ভারতের নবনিযুক্ত হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে ‘একই আকাশ, একই বাতাস’ বলে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে কাব্যিক এবং কূটনৈতিকভাবে আকর্ষণীয়। তবে সীমান্তের কাঁটাতারের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের কাছে আকাশের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা, বাতাসের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মর্যাদা, আর কবিতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ন্যায়বিচার। বন্ধুত্বের ভাষা তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার প্রতিফলন দেখা যাবে বাস্তব নীতিতে।

কূটনীতির ভাষা বনাম বাস্তবতা

কূটনীতির ভাষা সাধারণত কোমল হয়। সংঘাতকে বলা হয় ‘চ্যালেঞ্জ’, বিরোধকে বলা হয় ‘মতপার্থক্য’, আর কঠিন বাস্তবতাকে ঢেকে দেওয়া হয় সুন্দর শব্দের আবরণে। কিন্তু ইতিহাস একটি সহজ সত্য শিখিয়েছে—কূটনীতিতে কথার চেয়ে কাজের মূল্য অনেক বেশি। দিনশেষে জনগণ বক্তৃতা নয়, বাস্তবতা দেখে।

ত্রিবেদীর বক্তব্য—‘অভিন্ন স্বপ্ন’, ‘১৪০ কোটির সঙ্গে ২০ কোটি মিলে ১৬০ কোটি মানুষ’—শুনতে সুন্দর। তিনি ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার কথাও বলেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই বক্তব্যগুলোর বাস্তব মূল্য কতটুকু? কারণ একই সময়ে বাংলাদেশের মানুষ সীমান্তে হত্যা, অবৈধ পুশ-ইনের অভিযোগ, এবং তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন সমস্যা দেখছে। এই বৈপরীত্য কতদিন চলবে?

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তন

ভারতকে বুঝতে হবে—বাংলাদেশ আর আগের অবস্থানে নেই। গত এক দশকে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা দ্রুত বদলেছে। বঙ্গোপসাগর আজ ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, জাপান—সবাই বাংলাদেশকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করছে। শুধু ২০ কোটি মানুষের বাজার হিসেবে নয়, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত রাষ্ট্র হিসেবেও বাংলাদেশের গুরুত্ব বেড়েছে।

এ বাস্তবতায় ভারত যদি পুরোনো মানসিকতা ধরে রাখে, সম্পর্ককে সমমর্যাদার ভিত্তিতে না দেখে, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিটা ভারতেরই হবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইন বিতর্ক

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সমস্যা কখনো জনগণের মধ্যে ছিল না। সমস্যা তৈরি হয়েছে নীতিগত ও রাজনৈতিক কিছু প্রশ্নে। সীমান্ত হত্যা তার মধ্যে অন্যতম। নিরস্ত্র মানুষকে গুলি করে হত্যা কোনো সভ্য রাষ্ট্রের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশের জনগণ বহু বছর ধরে সীমান্ত হত্যা দেখে এসেছে। প্রতিবারই আশ্বাস এলেও ইস্যুটি এখনো সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক ছায়া ফেলেছে।

ভারত যদি সত্যিই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়, তাহলে বুঝতে হবে যে কোনো দেশই তার সীমান্তে একতরফা আচরণ মেনে নেবে না। প্রতিবেশী সম্পর্কের মূল ভিত্তি হচ্ছে পারস্পরিক সম্মান।

তিস্তা ও অন্যান্য অমীমাংসিত প্রশ্ন

তিস্তা চুক্তি নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা চলছে। প্রতিশ্রুতি এসেছে, কিন্তু সমাধান আসেনি। শুধু তিস্তাই নয়, অভিন্ন নদীগুলোর পানিবণ্টন নিয়েও অসংখ্য প্রশ্ন রয়ে গেছে। ভারত যদি নতুন আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে চায়, তাহলে এসব প্রশ্নে খোলা মনে এগিয়ে আসতে হবে।

রোহিঙ্গা সংকটের শিক্ষা

২০১৭ সালে রোহিঙ্গা সংকটের সময় ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ঢাকায় এসে বলেছিলেন, ‘সবচে পেহেলে বাংলাদেশ’। বক্তব্যটি ইতিবাচক ছিল, কিন্তু পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে ভারত সবসময় বাংলাদেশের প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি একাত্ম হয়নি। এ কারণে বাংলাদেশের অনেকের মনে ধারণা তৈরি হয়েছে যে, দিল্লির কূটনৈতিক ভাষা ও কৌশলগত অবস্থানের মধ্যে প্রায়ই ব্যবধান থাকে।

‘একসঙ্গে’ শব্দটির প্রকৃত অর্থ

ত্রিবেদী বলেছেন, ‘আমরা আলাদা নই, একসঙ্গে চিন্তা করতে চাই।’ যদি ‘একসঙ্গে’ বলতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সমমর্যাদার অংশীদারিত্ব ও অভিন্ন সমৃদ্ধি বোঝানো হয়, তাহলে বাংলাদেশ তার পক্ষে। কিন্তু যদি একতরফা সুবিধা বোঝানো হয়, তাহলে তা কখনো টেকসই হবে না। আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি হচ্ছে পারস্পরিক স্বার্থের ভারসাম্য।

উপসংহার: কাজের সময়

বন্ধুত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা বক্তৃতায় নয়, আচরণে। একদিকে সীমান্তে গুলি চলবে, অন্যদিকে ভালোবাসার গান শোনানো হবে—এটি কার্যকর কূটনীতি হতে পারে না। তবুও আশাবাদের জায়গা আছে। ত্রিবেদীর বক্তব্য যদি বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেয়, তাহলে তা স্বাগত জানানো উচিত। আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তিনি কী বললেন, সেটি নয়; বরং ভারত কী করবে, সেটি। কারণ রাষ্ট্রের সম্পর্ক টিকে থাকে বিশ্বাসের ওপর, কবিতার ভাষার ওপর নয়। ‘একই আকাশ, একই বাতাস’—এই কথার প্রকৃত মূল্য তখনই তৈরি হবে, যখন সীমান্তে রক্ত ঝরবে না, পুশ-ইনের অভিযোগ থাকবে না, তিস্তার পানি ন্যায্যভাবে বণ্টন হবে, এবং সম্পর্ক পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে দাঁড়াবে। তখনই কবিতার ভাষা অর্থ পাবে। তার আগে নয়।