মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ-আলজেরিয়ার গভীর মিল: তথ্যমন্ত্রী
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ-আলজেরিয়ার মিল: তথ্যমন্ত্রী

তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, বাংলাদেশ ও আলজেরিয়ার স্বাধীনতার ইতিহাস, আত্মত্যাগ এবং মুক্তির চেতনার মধ্যে গভীর মিল রয়েছে। রোববার (৫ জুলাই) ঢাকায় আলজেরিয়ার ৬৪তম স্বাধীনতা দিবস ও জাতীয় যুব দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

স্বাধীনতা সংগ্রামের মিল

তথ্যমন্ত্রী বলেন, 'আলজেরিয়া ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, আর বাংলাদেশ লড়াই করেছে পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে। উভয় দেশের লাখো শহীদ দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাদের এই আত্মত্যাগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয়।'

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূত আবদেলওয়াহাব সাইদানি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, বাংলাদেশ-আলজেরিয়া বিজনেস ফোরামের সভাপতি মোহাম্মদ নুরুল মোস্তফাসহ ব্যবসায়ী, বিশিষ্টজন, সাংবাদিক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যুবসমাজের ত্যাগ ও দেশপ্রেম

মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও আলজেরিয়ার যুবসমাজ স্বাধীনতার জন্য অসাধারণ ত্যাগ স্বীকার করেছে। তাদের কাছ থেকে নতুন প্রজন্মের শেখার সবচেয়ে বড় বিষয় হলো দেশের জন্য আত্মনিবেদন ও দেশপ্রেম।

তিনি দুই দেশের সম্পর্ক আরো জোরদারের আহ্বান জানিয়ে বলেন, 'বাংলাদেশ ও আলজেরিয়ার মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিপুল সুযোগ রয়েছে।' তিনি বাংলাদেশ-আলজেরিয়া বিজনেস ফোরামের কার্যক্রমের প্রশংসা করেন এবং এর সভাপতি মোহাম্মদ নুরুল মোস্তফার ভূমিকাকে সাধুবাদ জানান।

আলজেরিয়ার কৌশলগত গুরুত্ব

জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, 'আলজেরিয়া প্রাকৃতিক ও খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ একটি দেশ। দেশটি ইউরোপের মোট গ্যাস আমদানির প্রায় ১৪ শতাংশ সরবরাহ করে, যা এর কৌশলগত গুরুত্বকে আরো বাড়িয়েছে।' একই সঙ্গে ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত আলজিয়ার্স বিশ্বের অন্যতম সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন শহর বলে উল্লেখ করেন তিনি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিশ্বে উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী নেটওয়ার্ক, বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব প্রয়োজন। বাংলাদেশ ও আলজেরিয়া উভয় দেশই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাস করে। দুই দেশের পতাকার সবুজ ও লাল রঙের মধ্যেও স্বাধীনতার চেতনার প্রতীকী মিল রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় হবে।

আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস

আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূত আবদেলওয়াহাব সাইদানি বলেন, 'আলজেরিয়ার স্বাধীনতা কেবল একটি দেশের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির ইতিহাস নয়; এটি বিশ্বব্যাপী মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামের এক অনন্য প্রতীক। আলজেরিয়ার জনগণের আত্মত্যাগ আজও বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষকে অনুপ্রাণিত করে।'

তিনি বলেন, ১৯৬২ সালের ৫ জুলাই ১৩২ বছরের ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে আলজেরিয়া। একই দিন দেশটিতে জাতীয় যুব দিবসও পালিত হয়, কারণ স্বাধীনতা সংগ্রামে তরুণদের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল 'দ্য লেগ্যাসি অব জেনারেশনস' বা 'প্রজন্মের উত্তরাধিকার', যা স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগকারী পূর্বসূরিদের স্মরণ এবং নতুন প্রজন্মকে দেশ গঠনে উদ্বুদ্ধ করার বার্তা বহন করে।

রাষ্ট্রদূত বলেন, 'আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল উপনিবেশবিরোধী ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। এ যুদ্ধে প্রায় ৫৬ লাখ আলজেরীয় শহীদ হন।' স্বাধীনতার পর আলজেরিয়া শুধু নিজের উন্নয়নই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন মুক্তি আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা ও সহায়তা দিয়েছে। এ কারণেই একসময় দেশটিকে 'বিপ্লবীদের মক্কা' বলা হতো।

আলজেরিয়ার পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতি

তিনি বলেন, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, জোটনিরপেক্ষতা ও উপনিবেশবিরোধী নীতিই আলজেরিয়ার পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি। ফিলিস্তিন ও পশ্চিম সাহারা ইস্যুসহ বিশ্বের নিপীড়িত জনগণের ন্যায্য অধিকারের পক্ষে আলজেরিয়া সবসময় সোচ্চার।

রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, ভূমধ্যসাগর ও সাহেল অঞ্চলের সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে আলজেরিয়া আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দেশটি ইউরোপের মোট গ্যাস আমদানির প্রায় ১৪ শতাংশ সরবরাহ করে এবং জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

তিনি জানান, স্বাধীনতার পর শিক্ষা, প্রযুক্তি ও অর্থনীতিতে আলজেরিয়া উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তরুণ উদ্যোক্তারা প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপ, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছেন। ২০২৬-২০২৯ সালের জাতীয় যুব পরিকল্পনার মাধ্যমে এসব উদ্যোগকে আরো শক্তিশালী করা হচ্ছে।

রাষ্ট্রদূত বলেন, '২০২৬ সালে আলজেরিয়ার জিডিপি ৩১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।' নতুন বিনিয়োগ আইনসহ বিভিন্ন সংস্কারের ফলে দেশটি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। তিনি বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের ওষুধশিল্প, কৃষি, জ্বালানি ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। এসব খাতে শতভাগ বিদেশি মালিকানা, কর অব্যাহতি এবং বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রণোদনার সুবিধা রয়েছে বলে জানান তিনি।

ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতা

বাংলাদেশ-আলজেরিয়া বিজনেস ফোরামের ভূমিকা তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত বলেন, ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের সফর, নেটওয়ার্কিং এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ফোরামটি দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা আরও জোরদার করছে।

বাংলাদেশ ও আলজেরিয়ার ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্বাধীনতার সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ইতিহাস দুই দেশের বন্ধুত্বকে আরও দৃঢ় করেছে। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম আরব দেশ ছিল আলজেরিয়া। সেই ঐতিহাসিক সম্পর্কের ভিত্তিতেই বর্তমানে দুই দেশ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণে কাজ করছে।