গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রথম পরীক্ষা: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেছেন, ন্যায্যতা ও জলবায়ু সহনশীলতার ভিত্তিতে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তিটি হবে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য প্রথম পরীক্ষা। ভারতের টিভি চ্যানেল এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই মন্তব্য করেন, যা আজ শনিবার প্রচারিত হয়। মরিশাসের রাজধানী পোর্ট লুইসে ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্সে অংশ নেওয়ার সময় তিনি এই সাক্ষাৎকার দেন।
চুক্তির মেয়াদ শেষ ও সংশোধনের আহ্বান
১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ এ বছরের ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে। চুক্তি থাকা অবস্থায়ও পানির প্রাপ্যতা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে, বিশেষত শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ার অভিযোগ করে আসছে। মেয়াদ শেষ হওয়ায় এখন চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো বা নতুন চুক্তি করার বিষয়টি জরুরি হয়ে উঠেছে।
খলিলুর রহমান বলেন, ‘গঙ্গার পানির সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা বাঁচা-মরার। আমার পুরো সভ্যতা ও জীবিকা গঙ্গার পানি প্রাপ্যতার ওপর নির্ভরশীল। এখন যে চুক্তিটা আছে, তা কয়েক মাসের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। আমরা একটি সংশোধিত চুক্তি দেখতে চাই, যা মানুষের জরুরি প্রয়োজন মেটাতে পারবে।’ তিনি সতর্ক করে দেন যে পানির বণ্টন যথাযথ না হলে বাংলাদেশের জীবিকা, কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তায় বিরূপ প্রভাব পড়বে।
ভিসা সহজীকরণ ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক
দেড় বছর ধরে বাংলাদেশ-ভারত উভয় দেশই ভিসাদান সীমিত করে রেখেছিল। খলিলুর রহমান জানান, বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার তিন দিনের মধ্যে ভারতের সব ধরনের নাগরিকের জন্য ভিসা চালু করে দেওয়া হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে ভারতও একই ধরনের পদক্ষেপ নেবে, যা জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে সাহায্য করবে।
তিনি বলেন, ‘জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগই সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখবে। এক দেশের জনগণকে অন্য দেশে আসতে না দেওয়া মানে আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন এবং পরিচিত হওয়ার পথটা আটকে দেওয়া।’ উদাহরণ হিসেবে তিনি বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের চিকিৎসা ভিসার ওপর নির্ভরতার কথা উল্লেখ করেন, যা বিঘ্নিত হলে মানুষ বিকল্প গন্তব্য খুঁজতে বাধ্য হয়।
চীন-ভারত সম্পর্কের প্রসঙ্গ
বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করলে ভারতের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে, এমন উদ্বেগের বিষয়ে খলিলুর রহমান বলেন, ‘ভারত কিংবা চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু এক পক্ষের লাভের নিরিখে পরিচালিত নয়। যদি কোনো উদ্বেগ থেকেই থাকে, আমাদের ভারতীয় বন্ধুরা সেটা সুনির্দিষ্টভাবে স্পষ্ট করেই জানাতে পারে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘অন্য কোন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কারও ক্ষতির বিনিময়ে নয়। চীনের সঙ্গে সহযোগিতা ও ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য—দুটোই বাজারভিত্তিক বাস্তবতার ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়ে থাকে। চলুন, এসব উদ্বেগ দূরে সরিয়ে রাখি। সম্পর্ককে আমাদের এক দেশের লাভ—এই দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখি। এতে কারও উপকার হয় না।’
সাম্প্রতিক সফর ও বৈঠক
খলিলুর রহমান গত ৭ ও ৮ এপ্রিল ভারত সফর করেন, যা বাংলাদেশের নতুন সরকারের প্রথম মন্ত্রী হিসেবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। দিল্লিতে তিনি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন, পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসমন্ত্রী হারদ্বীপ সিং পুরির সঙ্গেও দেখা করেন। এই সফর দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দিকে একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২৪ সালে জুলাই মাসে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছিল। তবে গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কে উন্নতির আভাস দেখা যাচ্ছে, যেখানে গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করতে পারে।



