ইরান যুদ্ধে নেতৃত্বের লড়াই: চীনের শান্তি উদ্যোগ ও মার্কিন সংশয়
ইরান যুদ্ধে চীনের শান্তি উদ্যোগ, মার্কিন সংশয়

ইরান যুদ্ধে বৈশ্বিক নেতৃত্বের লড়াইয়ে চীনের কূটনৈতিক তৎপরতা

ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতিতে নিজেদের নেতৃত্বের প্রভাব বৃদ্ধির লক্ষ্যে জোরদার কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে চীন। বেইজিং পাকিস্তানের সঙ্গে মিলে পাঁচ দফার একটি শান্তি প্রস্তাব পেশ করার পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থন আদায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করতে সামরিক শক্তি প্রয়োগের যেকোনও জাতিসংঘ প্রস্তাবের বিরোধিতা করছে দেশটি। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার এটিই চীনের সর্বশেষ বড় প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

মার্কিন সংশয় ও চীনের কৌশলগত অবস্থান

ওয়াশিংটন বেইজিংয়ের এই উদ্যোগে বিশেষ আগ্রহ না দেখানোয় এটি শেষ পর্যন্ত কার্যকর কোনও সমাধানে পৌঁছাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক স্টিমসন সেন্টারের চীনা প্রোগ্রামের পরিচালক সান ইউন বলেছেন, "মধ্যপ্রাচ্যের ও বাইরের সব দেশের কাছে এখন ইরান যুদ্ধই প্রধান অগ্রাধিকার। চীন এই সুযোগটি হাতছাড়া করতে চায় না এবং এর মাধ্যমে তারা নিজেদের কূটনৈতিক ও বৈশ্বিক নেতৃত্ব প্রমাণ করতে চাইছে।"

তবে সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ড্যানি রাসেল চীনের এই তৎপরতাকে 'লোকদেখানো' হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি একে ২০২৩ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য দেওয়া চীনের ১২ দফা পরিকল্পনার সঙ্গে তুলনা করে বলেন, "চীন বোঝাতে চায় যে ওয়াশিংটন যেখানে বেপরোয়া ও আক্রমণাত্মক, সেখানে বেইজিং শান্তি ও শৃঙ্খলার পক্ষে। আসলে আমরা যা দেখছি তা মধ্যস্থতা নয়, বরং নিজেদের বার্তার প্রচার মাত্র।"

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চীনের দাবি ও মার্কিন প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া

ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের মুখপাত্র লিউ পেঙ্গু অবশ্য দাবি করেছেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই চীন 'অক্লান্তভাবে শান্তির জন্য' কাজ করে যাচ্ছে। তবে তিনজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানা গেছে, ট্রাম্প প্রশাসন চীনের মধ্যস্থতা নিয়ে মোটেই উৎসাহিত নয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তারা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় আগ্রহী নয়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের কোনও সাফল্য বা আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাক, এমন কোনও সুযোগ তারা দিতে চায় না।

চীনের এই শান্তি প্রস্তাবের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান অবস্থান হলো, তারা এটিকে সমর্থনও করছে না, আবার সরাসরি প্রত্যাখ্যানও করছে না। তবে আগামী মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চীন সফরের আগে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে। উল্লেখ্য, যুদ্ধের কারণে ট্রাম্পের মার্চে নির্ধারিত চীন সফরটি ইতোমধ্যে পিছিয়ে গেছে।

অর্থনৈতিক উদ্বেগ ও কূটনৈতিক কার্যক্রম

হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় অনেক দেশ সংকটে পড়লেও চীন এখন পর্যন্ত কিছুটা নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে। চীন তার তেলের চাহিদার মাত্র ১৩ শতাংশ ইরানের কাছ থেকে মেটায় এবং বর্তমানে তারা তেহরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নিজস্ব পতাকাবাহী জাহাজগুলো চলাচলের সুযোগ করে নিয়েছে। তা সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চীনের অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ড্যানি রাসেল বলেন, "চীনের প্রবৃদ্ধি যেহেতু রফতানি-নির্ভর, তাই জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য এবং জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাবে, যা চীনের ভঙ্গুর অর্থনীতির ক্ষতি করবে।" ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের গবেষক আলী ওয়াইন বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের সুনির্দিষ্ট কৌশলের অভাবকে পুঁজি করে চীন নিজেকে একটি সংকট অবসানকারী শক্তি হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ নিচ্ছে।

জাতিসংঘ প্রস্তাব ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই রাশিয়া, ইরান, ফ্রান্স, ইসরায়েল ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে ২০ বারের বেশি ফোনে কথা বলেছেন। গত সপ্তাহে তিনি বেইজিংয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পাঁচ দফা প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছেন। ওয়াং ই ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস এবং সৌদি আরবের ফয়সাল বিন ফারহানকেও জানিয়েছেন যে যুদ্ধ বন্ধ করাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।

তবে বাহরাইনের পক্ষ থেকে জাতিসংঘে আনা একটি প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে চীন। ওই প্রস্তাবে হরমুজ প্রণালি খুলতে সামরিক শক্তি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছিল। চীন ও রাশিয়ার যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্র এই সুযোগ নিয়ে যুদ্ধের তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। জাতিসংঘের একজন কূটনীতিক জানিয়েছেন, বাহরাইন তাদের প্রস্তাবটি সংশোধন করে কেবল 'প্রতিরক্ষামূলক' ব্যবস্থার কথা বললেও ভোটগ্রহণ আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।

মূলত যুদ্ধবিরতি ছাড়া হরমুজ সংকটের সমাধান দেখছে না চীন। তবে তাদের এই পরিকল্পনা নিয়ে এখন পর্যন্ত নিশ্চুপ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, চীনের প্রস্তাবটি কোনও সুনির্দিষ্ট 'রোডম্যাপ' নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার এক অস্পষ্ট আবেদন মাত্র।