মিয়ানমারে বন্দি রামগতির ৯ জেলে: পরিবারগুলোর হাহাকার ও সরকারি তৎপরতা
লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার চর পোড়াগাছা গ্রামের ৯ জেলে পরিবার আজ চরম দিশেহারা অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। গভীর সমুদ্রে মাছ শিকারে গিয়ে মিয়ানমার কোস্টগার্ডের হাতে বন্দি হওয়া এই জেলেদের উদ্ধারে সরকারি পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও এখনো কোনো সফলতা আসেনি।
হৃদয়বিদারক দৃশ্য ও পরিবারগুলোর বুকফাটা আর্তনাদ
সরেজমিনে চরপোড়াগাছা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নারী, শিশু ও বৃদ্ধ বাবা-মায়েরা প্রিয়জনের ফেরার প্রতীক্ষায় এক বুক হাহাকার নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। কারো হাতে স্বামীর শেষ স্মৃতি হিসেবে থাকা গামছা, কেউবা কোলের শিশুকে নিয়ে নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন সাগরের দিকে। বৃদ্ধা মা ফাতেমা বেগম বিলাপ করে বলছেন, "বাবারে, শেষবার যখন কথা অইল, পোলায় কইল মা ওরা আমাগোরে ধইরা লইয়া যায়। এরপর থাইকা মোবাইল বন্ধ। ওগো নাকি খাইতে দেয় না, মারধর করে। আমার মানিকরে কি আর ফিরা পামু? সরকার কি পারে না আমার বাজানরে ফিরায়া আনত?"
অর্থনৈতিক সংকট ও নিরাপত্তার শঙ্কা
এই ৯টি পরিবারের অধিকাংশেরই আয়ের একমাত্র উৎস ছিলেন এই জেলেরা। গত কয়েকদিন ধরে অনেক ঘরে চুলা জ্বলে না, শিশুদের মুখে ঠিকমতো অন্ন জুটছে না। তবে পেটের ক্ষুধার চেয়েও প্রিয়জনের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা এখন সব কিছুকে ছাপিয়ে গেছে। স্থানীয় সমাজকর্মী মো. নিজাম উদ্দিন জানান, "এটি কেবল আইনি বিষয় নয়, এটি ১৬টি পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াই। আমরা চাই সরকারি পর্যায়ে দ্রুত কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে আমাদের ভাইদের ফিরিয়ে আনা হোক।"
ঘটনার বিবরণ ও সরকারি পদক্ষেপ
জানা গেছে, গত ২২ মার্চ লক্ষ্মীপুর থেকে সাগরের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া ১৬ জেলের এই দলটি গত ২৮ মার্চ শেষবারের মতো বাড়িতে কথা বলতে পেরেছিলেন। তখন তারা জানিয়েছিলেন, কক্সবাজারের উখিয়া সংলগ্ন বাংলাদেশ-মিয়ানমার জলসীমা থেকে মিয়ানমার কোস্টগার্ড তাদের আটক করে নিয়ে গেছে। সেখানে তারা চরম খাদ্য সংকট ও অমানবিক পরিস্থিতির শিকার। এরপর থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে সব যোগাযোগ।
এদিকে ট্রলার মালিক পক্ষ ইতোমধ্যে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে আবেদন জানিয়েছেন। রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিলুফার ইয়াসমিন নিপা বলেন, "নিখোঁজ হওয়া ১৬ জন জেলের বিষয়টি আমাদের গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। বিশেষ করে রামগতির ৯ জন জেলের পরিবার আজ দিশেহারা, তাদের কষ্ট আমরা অনুধাবন করছি। এটি কেবল দাপ্তরিক দায়িত্ব নয়, আমাদের মানবিক দায়বদ্ধতা। আমি ব্যক্তিগতভাবে সরকারের উচ্চপর্যায় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে যোগাযোগ করছি। কোস্টগার্ডসহ অন্যান্য সংস্থাগুলোও তৎপর রয়েছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি জেলেরা যেন দ্রুত ও নিরাপদে তাদের প্রিয়জনদের বুকে ফিরে আসতে পারেন।"
নিখোঁজ জেলেদের তালিকা ও আশার আলো
নিখোঁজ জেলেদের মধ্যে লক্ষ্মীপুরের রামগতির ৯ জন ছাড়াও নোয়াখালীর ৩ জন, চট্টগ্রামের ৩ জন এবং ভোলার ১ জন রয়েছেন। তাদের সকলের পরিবার এখন একটাই প্রার্থনা করছেন, বাংলাদেশ সরকারের শক্তিশালী কূটনৈতিক পদক্ষেপে যেন দ্রুত মিয়ানমারের জিম্মি দশা থেকে জেলেদের ফিরিয়ে আনা যায়। প্রিয়জনদের ফিরে আসার অপেক্ষায় এমনটাই স্বপ্ন দেখছেন স্বজনরা, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত এখন অনিশ্চয়তা ও উৎকণ্ঠায় ভরা।



