ইরানের মাহান এয়ার: মার্কিন হামলার পর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণ ও ভারতের অবস্থান
মাহান এয়ার: মার্কিন হামলা, নিষেধাজ্ঞা ও ভারতের সম্পর্ক

ইরানের মাহান এয়ার: মার্কিন হামলার পর বিশ্ব রাজনীতির আলোচনায়

ইরানের মাশহাদ বিমানবন্দরে চলতি সপ্তাহে এক মার্কিন বিমান হামলায় দেশটির বেসরকারি বিমান সংস্থা ‘মাহান এয়ার’-এর একটি উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ঘটনার পর তিন দশক ধরে বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা এ বিমান সংস্থাটি আবারও বিশ্ব রাজনীতির আলোচনার তুঙ্গে চলে এসেছে। ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত বিমানটি ১ এপ্রিল ভারতের নয়াদিল্লিতে একটি মানবিক মিশনে যাওয়ার কথা ছিল।

মানবিক মিশন ও মার্কিন নীরবতা

গত ১৮ মার্চ ভারত থেকে পাঠানো প্রথম দফার চিকিৎসা সহায়তার পর, এ ফ্লাইটে করে জরুরি ওষুধ ও সরঞ্জাম সংগ্রহের পরিকল্পনা ছিল। নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত ইরানি দূতাবাস এ সহায়তার জন্য ভারতকে ধন্যবাদ জানালেও মার্কিন কর্মকর্তারা এখন পর্যন্ত এ হামলা বা ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেননি। এই নীরবতা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

মাহান এয়ার: বেসামরিক বিমান নাকি কৌশলগত অস্ত্র?

১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত মাহান এয়ার ইরানের প্রথম বেসরকারি বিমান সংস্থা হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও এর নেপথ্য কাহিনি বেশ জটিল। আন্তর্জাতিক মহলে দীর্ঘকাল ধরে অভিযোগ রয়েছে যে, এ সংস্থাটি ইরানের ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ (আইআরজিসি) বিশেষ করে তাদের এলিট ‘কুদস ফোর্স’র লজিস্টিক শাখা হিসেবে কাজ করে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নিষেধাজ্ঞার ক্রমবিকাশ

২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম মাহান এয়ারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তাদের অভিযোগ ছিল, বেসামরিক ফ্লাইটের আড়ালে এ সংস্থাটি যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে অস্ত্র, অর্থ এবং সৈন্য সরবরাহ করে। এরপর একে একে অন্য দেশগুলোও কঠোর ব্যবস্থা নিতে শুরু করে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
  • ২০১৬ সালে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে সৌদি আরব মাহান এয়ারকে নিষিদ্ধ করে।
  • ২০১৯ সালে জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি এবং স্পেন পর্যায়ক্রমে নিষেধাজ্ঞা দেয়।
  • ২০২৪ সালে রাশিয়াকে ড্রোন ও মিসাইল সরবরাহের অভিযোগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন মাহান এয়ার-এর ওপর পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং ইউরোপের অধিকাংশ দেশে মাহান এয়ারের প্রবেশাধিকার নেই।

অভিযোগ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি

পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি, মাহান এয়ার দামেস্ক এবং বৈরুত রুটে নিয়মিত অস্ত্র পরিবহণ করে, যা হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠীগুলোর কাছে পৌঁছায়। এছাড়া ভুয়া নামে হাজার হাজার টিকিট বুকিং এবং পাইলটদের সঙ্গে রেভল্যুশনারি গার্ডের যোগসূত্র নিয়ে বহুবার তদন্ত হয়েছে। তবে তেহরান সব সময়ই এ অভিযোগ অস্বীকার করে একে একটি বৈধ বাণিজ্যিক সংস্থা হিসেবে দাবি করে আসছে।

পাশাপাশি পুরোনো বিমান ব্যবহারের কারণে মাহান এয়ারের নিরাপত্তার মানও বেশ নিম্নমুখী। ২০০৬ সালে বার্মিংহামে অল্পের জন্য সংঘর্ষ এড়ানো কিংবা ২০১৫ সালে মাঝ আকাশে ইঞ্জিনের ভয়াবহ ত্রুটির মতো একাধিক যান্ত্রিক দুর্ঘটনার রেকর্ড রয়েছে সংস্থাটির।

ভারতের ইতিবাচক অবস্থান

বিশ্বের অনেক দেশ মুখ ফিরিয়ে নিলেও মাহান এয়ারের বিষয়ে ভারতের অবস্থান এখনো ইতিবাচক। এর অন্যতম কারণ কোভিড-১৯ মহামারির সময় এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক সংকটে আটকে পড়া ভারতীয়দের উদ্ধার করতে মাহান এয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পাশাপাশি কৌশলগত সম্পর্ক বিবেচনা করে ইরানের চাবাহার বন্দর প্রকল্প এবং জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে ভারত তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে চায়।

এই জটিল প্রেক্ষাপটে মাহান এয়ারের ভবিষ্যৎ এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি সংবেদনশীল ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন হামলা এবং ভারতের সমর্থন এই সংকটকে আরও গভীর করেছে, যা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করছে।