মিয়ানমার সরকারের রোহিঙ্গা তথ্য যাচাইয়ে ধীরগতি, সংসদে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মিয়ানমারে পাঠানো রোহিঙ্গাদের তালিকার মধ্যে মাত্র সাড়ে তিন লাখ মানুষের তথ্য যাচাই করতে পেরেছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। সেখান থেকে আড়াই লাখ মানুষকে নিজেদের নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করেছে দেশটি। আজ সোমবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এ তথ্য জানিয়েছেন।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার বর্তমান অবস্থা
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সংসদে বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ নিয়মিতভাবে রোহিঙ্গা তথ্য যাচাইকরণ করছে।’ এ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ৬ ধাপে ৮ লাখ ২৯ হাজার ৩৬ জন রোহিঙ্গার তথ্য মিয়ানমার সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৭৫১ জনের (জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত) তথ্য যাচাই করেছে। এর মধ্যে মিয়ানমার সরকার ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৬৪ জনকে ‘পূর্বে মিয়ানমারে বসবাসকারী ব্যক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
মিয়ানমারের চলমান সংঘাতের কারণে এখনই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না বলে উল্লেখ করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান হচ্ছে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন।’ এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা ও সমর্থন জোরদারের পাশাপাশি বাংলাদেশ কূটনৈতিক, আইনি ও মানবিক সব উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে।
আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের ভূমিকা
দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রক্রিয়াসমূহে বাংলাদেশ নৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন প্রদান করেছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যা সংগঠনের দায়ে নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) ‘গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার’ একটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। সেই মামলা পরিচালনায় বাংলাদেশ আর্থিক সহায়তা প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশ এই আইনি প্রক্রিয়াকে গভীর গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চলমান উদ্যোগগুলোকে সমর্থন করছে।
রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ ও কূটনৈতিক উদ্যোগ
জামালপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এ ই সুলতান মাহমুদের প্রশ্নের জবাবে খলিলুর রহমান বলেন, সরকারের দেশের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি তথা কূটনীতির সফল প্রয়োগের মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে আন্তর্জাতিক সম্পর্কোন্নয়নে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, ‘ইউরোপ, আমেরিকার মতো প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি দেশি পণ্যের নতুন নতুন বাজার অনুসন্ধানে সরকার কাজ করছে।’
- মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের উদীয়মান অর্থনীতির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করা হচ্ছে।
- সম্ভাবনাময় দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি, অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা (পিটিএ) এবং মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলমান রয়েছে।
- রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, দেশের রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে তৈরি পোশাক খাতের এককেন্দ্রিক নির্ভরশীলতা কমিয়ে রপ্তানিযোগ্য পণ্য সমৃদ্ধ বহুমাত্রিক রপ্তানি কাঠামো গড়ে তোলার ওপর বর্তমান সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
পররাষ্ট্রনীতিতে জাতীয় স্বার্থের প্রাধান্য
নোয়াখালী-৫ আসনের মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের উল্লেখযোগ্য নীতিগত পরিবর্তন হলো জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রক্ষা করা। তিনি বলেন, ‘দেশের সার্বভৌমত্ব, ভৌগলিক অখণ্ডতা, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভিত্তিতে আমরা পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘মধ্যপ্রচ্যে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে জিসিসিভুক্ত দেশগুলো এবং ইরান উভয় পক্ষই যে বাংলাদেশকে একটি বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করছে, তা আমাদের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির প্রাথমিক ফলাফল।’
দেশের কর্মসংস্থান পরিসংখ্যান
ফেনী-১ আসনের জয়নাল আবেদীনের প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, শ্রম জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ৭ কোটি, ১০ লাখ, ১০ হাজার। এর মধ্যে পুরুষ চার কোটি, ৮০ লাখ ২০ হাজার ও নারী ২ কোটি ৩৬ লাখ ৯০ হাজার। তিনি আরও বলেন, শ্রম জরিপ অনুযায়ী প্রতি বছর ১৩ লাখ ৬০ হাজার জনগোষ্ঠী কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছে। ২০২৬ সালের শ্রম জরিপ পরিচালনার জন্য একটি প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলেও তিনি জানান।



