ইরানের স্পিকার গালিবাফ: শান্তি আলোচনায় নেতৃত্ব ও বিতর্কিত রাজনৈতিক উত্থান
গালিবাফ: ইরানের শান্তি আলোচনায় নেতৃত্ব ও বিতর্ক

ইরানের স্পিকার গালিবাফ: শান্তি আলোচনায় নেতৃত্ব ও বিতর্কিত রাজনৈতিক উত্থান

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বর্তমানে আন্তর্জাতিক শান্তি আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় উঠে এসেছেন। চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। পাকিস্তানের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির পাশাপাশি গালিবাফকেও ইসরাইলের হিট লিস্ট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

গালিবাফের প্রাথমিক জীবন ও সামরিক ক্যারিয়ার

ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা আইআরআইবি-র মালিকানাধীন আরবি ভাষার টিভি চ্যানেল আল-আলামের তথ্য অনুযায়ী, গালিবাফ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর তোরঘাবেহ-র একটি ধর্মপ্রাণ, শ্রমিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মস্থান মাশহাদের কাছাকাছি, যেখানে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব বসবাস করতেন। ১৬ বছর বয়সে তিনি মাশহাদের প্রধান মসজিদগুলোয় ইরানের ভবিষ্যত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিসহ অন্যান্য বিপ্লবী আলেমদের ক্লাসে অংশ নিতে শুরু করেন।

১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পরপরই গালিবাফ ইরাক যুদ্ধে অংশ নেন এবং ২০ বছর বয়সে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-তে যোগ দেন। দুই বছর পর তিনি এই বাহিনীর একটি কমব্যাট ডিভিশনের কমান্ডার হন এবং ১৯৮৮ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। গালিবাফ আইআরজিসি কমান্ডার হওয়ার বছরেই বিয়ে করেন এবং সেই বিয়ে পরিচালনা করেছিলেন সর্বোচ্চ নেতা রুহুল্লাহ খোমেনি। এই দম্পতির তিন সন্তান আছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ছাত্র বিক্ষোভ দমন ও রাজনৈতিক প্রভাব

১৯৯৯ সালের জুলাই মাসে একটি সংস্কারপন্থী সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়ার প্রতিবাদে ছাত্র বিক্ষোভে ইসলামী প্রজাতন্ত্র উত্তাল হয়ে ওঠে। আন্দোলনটি সহিংসভাবে দমন করা হয়, যার ফলে বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয় এবং ধারণা করা হয় যে গালিবাফ ব্যক্তিগতভাবে এই দমন অভিযানে জড়িত ছিলেন। ফাঁস হওয়া একটি অডিও ফাইলে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘এখন ১০০০ সিসির মোটরবাইকে লাঠি হাতে আমার একটি ছবি আছে... যেখানেই রাস্তায় নেমে আসা এবং লাঠি ব্যবহার করার প্রয়োজন হয়, আমরাই তারা যারা সেটা করি এবং আমরা এতে গর্বিত।’

বিক্ষোভের পর আইআরজিসির ২৪ কমান্ডার তৎকালীন ইরানের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ খাতামিকে কড়া ভাষায় লেখা একটি চিঠিতে আইআরজিসির হস্তক্ষেপের হুমকি দেন। গালিবাফ বলেন, তিনি সেই দুজন কমান্ডারের একজন ছিলেন, যারা চিঠিটির খসড়া তৈরি করেছিলেন এবং স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছিলেন। অনেকেই এই চিঠিটিকে রাজনৈতিক বিষয়ে আইআরজিসির প্রভাবের একটি স্পষ্ট ঘোষণা হিসেবে দেখেন, যা তখন থেকে ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।

পুলিশ প্রধান থেকে তেহরানের মেয়র

ছাত্র বিক্ষোভের এক বছর পর ৩৯ বছর বয়সে গালিবাফ পুলিশ প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন। তার পাঁচ বছরের কার্যকালে, তিনি একটি জাতীয় জরুরি পুলিশ হটলাইন স্থাপন করেন এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের প্রক্রিয়াকে সহজ করেন। পুলিশ বাহিনীকে বিদেশি যানবাহন দিয়ে সজ্জিত করাকে তিনি তার সেরা অর্জন হিসেবে গর্ব করতেন, যদিও সমালোচকদের মতে, এটা ছিলো অনেক ব্যয়বহুল।

২০০৫ সালে গালিবাফ পুলিশ প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর, তিনি তেহরানের সিটি কাউন্সিল কর্তৃক মেয়র হিসেবে নিযুক্ত হন। তিনি ১২ বছর এই পদে ছিলেন এবং এখনও রাজধানীর মেয়র হিসেবে দীর্ঘতম মেয়াদের রেকর্ডটি তার দখলেই রয়েছে। যানজটপূর্ণ রাজধানীতে মেট্রো ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং 'সদর এক্সপ্রেসওয়ের' মতো পরিবহন অবকাঠামোর আধুনিকায়নের কৃতিত্ব তাকে দেওয়া হয়।

কেলেঙ্কারি ও সমালোচনা

২০১৬ সালে 'বিপুল মূল্যের সম্পত্তি' কেলেঙ্কারির পর গালিবাফের সুনাম ক্ষুণ্ণ হয়, যেখানে সিটি কাউন্সিলের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা কর্মীদের কাছে শত শত সম্পত্তি বাজার মূল্যের চেয়ে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বিশাল ছাড়ে বিক্রি করার অভিযোগ ওঠে। গালিবাফ ক্ষমতা ছাড়ার কয়েক মাস আগে, ইরানের অন্যতম প্রাচীন উঁচু ভবন, ১৭ তলা বিশিষ্ট প্লাস্কো বিল্ডিং-এ আগুন লেগে সেটি ধসে পড়ে এবং এতে অন্তত ২০ দমকলকর্মী নিহত হন। এই দুর্ঘটনা গালিবাফের নেতৃত্বে নগর সরকারের মধ্যে পদ্ধতিগত অবহেলাকে তুলে ধরে। তবে এরপরও কোনো কেলেঙ্কারির কারণেই গালিবাফকে বরখাস্ত বা এমনকি অভিশংসনও করা হয়নি।

রাষ্ট্রপতি পদে ব্যর্থ প্রচেষ্টা ও স্পিকার পদ

গালিবাফ সবসময়ই রাষ্ট্রপতি পদের দিকে নজর দিয়েছেন, কিন্তু ২০০৫, ২০১৩, ২০১৭ ও ২০২৪ সালে তার চারটি চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। তার প্রথমবারের চেষ্টায়, অভিজ্ঞ এই আইআরজিসি সৈনিক তার সামরিক ব্যাকগ্রাউন্ডকে বেশি তুলে ধরেছিলেন, কিন্তু পরে তিনি নিজেকে একজন পাইলট এবং পলিটিক্যাল জিওগ্রাফিতে পিএইচডি ডিগ্রিধারী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেন। তিনি নিজেকে একজন 'জিহাদি সংগঠক' হিসেবেও আখ্যা দিয়েছেন এবং সামরিক দক্ষতা ও নিষ্ঠার বড়াই করেছেন।

গালিবাফকে দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার বিরোধী হিসেবে বিবেচনা করা হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন লক্ষণ দেখা গেছে, যা থেকে বোঝা যায় যে তিনি রক্ষণশীল শিবিরের একাংশের সঙ্গে একটা পার্থক্য তৈরি করেছেন। ২০২৪ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে, কট্টরপন্থী রক্ষণশীলদের একটি বড় অংশ তার প্রার্থিতার বিরোধিতা করেছিল এবং তাকে প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য রাজি করানোর চেষ্টা করেছিল।

বর্তমান অবস্থান ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

২০২০ সালে তিনি পার্লমেন্ট নির্বাচনে একটি আসন জিতে স্পিকার হন এবং ২০২৪ সালে স্পিকার হিসেবে পুনরায় নির্বাচিত হন। মার্কিন মিডিয়া আউটলেট পলিটিকোর মতে, কিছু মার্কিন কর্মকর্তা গালিবাফকে দিয়ে কাজ চালানো যায়, এমন একজন অংশীদার হিসেবেই দেখে থাকেন। যদিও ৬৪ বছর বয়সী গালিবাফ শত্রুদের সতর্ক করেছেন, আমাদের ভূমি রক্ষার সংকল্পকে পরীক্ষা না করার জন্য এবং এক্স পোস্টে অবিরাম হামলার হুমকি দিয়েছেন।

ইরান যখন একটি সংকটময় সময়ে, তখন তার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এবং জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডার ও ক্ষমতার তিনটি প্রধান শাখার শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করার সক্ষমতার কারণে তার রাজনীতির ভাগ্য আবার খুলে যেতে পারে। মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় অনেক শীর্ষ নেতা নিহত হওয়ায়, অভিজাত আইআরজিসি-এর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তার অভিজ্ঞতা এবং একজন বাস্তববাদী, কিন্তু কট্টরপন্থী হিসেবে তার ভাবমূর্তি তাকে ক্ষমতার এক নতুন স্তরে পৌঁছে দিতে পারে।