১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের বাংলাদেশকে স্বীকৃতি: ভুট্টোর ইউ-টার্ন ও মুসলিম নেতাদের ভূমিকা
১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের বাংলাদেশ স্বীকৃতি: ইতিহাসের পটভূমি

১৯৭৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি লাহোর বিমানবন্দরে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত সৃষ্টি হয়েছিল, যখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো ও প্রেসিডেন্ট ফজল ইলাহি চৌধুরী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে ২১ বার তোপধ্বনি ও গার্ড অব অনার দিয়ে অভ্যর্থনা জানান। বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সংগীত বাজানোর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় পাকিস্তানের বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রক্রিয়া।

ভুট্টোর অবস্থান পরিবর্তনের কারণ

১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ায় যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত, বুলগেরিয়া, পোল্যান্ড ও মঙ্গোলিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে পাকিস্তান। ভুট্টো ঘোষণা দিয়েছিলেন, বাংলাদেশকে যে দেশ স্বীকৃতি দেবে, তার সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক ছিন্ন হবে।

কিন্তু দুই বছরের মধ্যে ভুট্টোর এই একগুঁয়ে মনোভাব সম্পূর্ণভাবে বদলে যায়। এর পেছনে প্রধান কারণ ছিল মুসলিম দেশগুলোর নেতাদের কূটনৈতিক চাপ ও পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ৯০ হাজারের বেশি পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দি ভারতে আটক ছিল, আর পাকিস্তানে আটকে পড়েছিল প্রায় চার লাখ বাংলাদেশি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যুদ্ধবন্দি প্রত্যাবাসন ও অভ্যন্তরীণ চাপ

১৯৭২ সালের জুলাইয়ে সিমলা চুক্তি ও ১৯৭৩ সালের আগস্টে দিল্লি চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধবন্দি প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ ও ভুট্টোর রাজনৈতিক বিরোধীরা যুদ্ধবন্দিদের দ্রুত ফেরানোর জন্য চাপ তৈরি করেন। সাংবাদিক হুসেইন নকির মতে, ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের মানুষ সরকার নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ার কারণে প্রকৃত সহিংসতা সম্পর্কে অজানা ছিল, কিন্তু পরে জানতে পেরে বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন তৈরি হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক দূরদর্শিতা

শেখ মুজিবুর রহমানের কূটনৈতিক প্রজ্ঞা মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে সহায়তা করে। ১৯৭৩ সালে সিরিয়া-মিশর-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসক ও চা পাঠিয়ে সহায়তা করা হয়। কূটনীতিক মুহাম্মদ জমিরের ভাষ্যমতে, এই উদ্যোগের ফলে মুসলিম নেতাদের মধ্যে বাংলাদেশ সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়, যা লাহোর সম্মেলনে আমন্ত্রণের পথ সুগম করে।

লাহোর যাওয়ার শর্তাবলি

ওআইসি সম্মেলনে অংশ নেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু তিনটি শর্ত দিয়েছিলেন: বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন, জাতীয় সংগীত বাজানো এবং সব মুসলিম রাষ্ট্রের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের স্বীকৃতি। কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আল-জাবের আল-সাবাহ এই শর্ত মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেন। ২২ ফেব্রুয়ারি ভুট্টো স্বীকৃতির ঘোষণা দেওয়ার পরদিন আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট হোরারি বুমেদিনের ব্যক্তিগত বিমানে করে বাংলাদেশি প্রতিনিধি দল লাহোর পৌঁছায়।

মুসলিম বিশ্বনেতাদের ভূমিকা

লাহোর সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো ও ভুট্টোর ওপর প্রভাব বিস্তারে সৌদি আরবের বাদশাহ ফয়সাল, মিশরের আনোয়ার সাদাত, আলজেরিয়ার বুমেদিনের মতো নেতারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা ছিল লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির ভূমিকা।

পাকিস্তানি সাংবাদিক জাভিদ আলী খানের বর্ণনায়, ২৩ ফেব্রুয়ারি শালিমার গার্ডেনসে নৈশভোজের সময় গাদ্দাফি শেখ মুজিব ও ভুট্টোর হাত এক করে ‘আখি, আখি’ বলে ডাকেন। এই পূর্বপরিকল্পিত মুহূর্তটি দুই দেশের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ জাগানোর জন্য মঞ্চায়িত হয়েছিল।

বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়া

সাংবাদিক হারুন হাবীবের মতে, পাকিস্তানের স্বীকৃতি বাংলাদেশে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। একদিকে স্বীকৃতি অর্জনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হয়, অন্যদিকে যুদ্ধের পর খুব অল্প সময়ে পাকিস্তান সফরে কিছু মানুষের ক্ষোভও ছিল। ১৯৭৪ সালের জুনে ভুট্টোর ঢাকা সফরে কিছু মানুষ তাকে স্বাগত জানালেও, কিছু মানুষ প্রতিবাদও করে। তবে বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলো স্বীকৃতির খবর ইতিবাচকভাবেই প্রকাশ করে।

হারুন হাবীব উল্লেখ করেন, বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের স্বীকৃতির দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন, কারণ এটি অন্যান্য মুসলিম দেশের স্বীকৃতি পাওয়ার পথ সুগম করবে। রাজনৈতিক অঙ্গনে কিছু বিতর্ক থাকলেও, এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করে।