সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক: পাচারকৃত অর্থ ফেরত ও সংস্কারে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি
বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত রেটো রেংগলির একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দপ্তরে এই সাক্ষাৎকারটি সম্পন্ন হয়। বৈঠকের কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয় ছিল বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা, পুলিশ বাহিনীর সংস্কার, এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন।
বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয়সমূহ
দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনায় নিম্নলিখিত বিষয়গুলো উঠে আসে:
- আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত ইস্যু
- সন্ত্রাসবাদ দমন ও প্রতিরোধ কৌশল
- সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চা ও রাজনৈতিক সংস্কার
- পুলিশ বাহিনীসহ বিভিন্ন খাতে সংস্কার উদ্যোগ
- আর্থিক সংস্কার ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ
- স্ক্যাম ও ডিজিটাল প্রতারণা মোকাবিলা
- বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া
- পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি ও ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ
সাক্ষাতের সূচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাষ্ট্রদূত রেটো রেংগলিকে আন্তরিক স্বাগত জানান। এরপর রাষ্ট্রদূত মন্ত্রীর নতুন পোর্টফোলিওতে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য তাঁকে অভিনন্দন জ্ঞাপন করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য: সংস্কার ও গণতন্ত্রের অঙ্গীকার
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ তাঁর বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন, "আমাদের সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হলো আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন। আমরা প্রকৃত সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।" তিনি অতীতের একটি সময়ের সমালোচনা করে উল্লেখ করেন যে, সে সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগে পুলিশ বাহিনীকে ব্যবহার করা হয়েছিল, যা অত্যন্ত দুঃখজনক ছিল।
মন্ত্রী সম্প্রতি অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত 'গ্লোবাল ফ্রড সামিট ২০২৬'-এ অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। তিনি জানান যে, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মোট প্রতারণার প্রায় ৪০ শতাংশই স্ক্যাম বা ডিজিটাল প্রতারণার মাধ্যমে সংঘটিত হচ্ছে। তিনি এটিকে একটি বৈশ্বিক সংকট হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, "আন্তঃদেশীয় সহযোগিতা ছাড়া ডিজিটাল প্রতারণাকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা সম্ভব নয়।"
সুইস রাষ্ট্রদূতের প্রতিশ্রুতি ও মতামত
রাষ্ট্রদূত রেটো রেংগলি পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পুলিশ সংস্কারের ক্ষেত্রে সুইজারল্যান্ডের পক্ষ থেকে কারিগরি ও কৌশলগত সহযোগিতার দৃঢ় আশ্বাস প্রদান করেন। তিনি বর্তমান সরকারের সংস্কার এজেন্ডা বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে মন্ত্রীর কাছ থেকে বিস্তারিত জানতে চান এবং সংসদকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
রাষ্ট্রদূত উল্লেখ করেন যে, সংসদসহ রাজনৈতিক অঙ্গনে শান্তিপূর্ণ বিতর্ক ও আলোচনা গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার জন্য অপরিহার্য। তিনি ডিজিটাল প্রতারণাকে একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও অপরাধ দমনে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
সন্ত্রাসবাদ ও আর্থিক সংস্কার প্রসঙ্গ
বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদ পরিস্থিতি সম্পর্কে রাষ্ট্রদূতের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেন, "বাংলাদেশে চরমপন্থা বা উগ্রবাদ স্বল্প মাত্রায় থাকতে পারে, কিন্তু তা কখনোই সন্ত্রাসবাদে রূপ নেয়নি।" তিনি আরও যোগ করেন যে, সন্ত্রাসবাদ দমনে পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট এবং ডিএমপি’র কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।
আর্থিক খাতের সংস্কার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের জন্য সংস্কার অপরিহার্য। রাষ্ট্রদূত রেংগলি এই মতের সাথে একমত পোষণ করে বলেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা যে কোনো রাষ্ট্রের উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রসঙ্গে মন্ত্রী বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং সামগ্রিক সংস্কার খাতে সুইজারল্যান্ড তাদের সহযোগিতা জোরদার করতে পারে।
উপস্থিতি ও পরবর্তী বৈঠক
এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক-১ শাখার যুগ্মসচিব রেবেকা খান এবং সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের কাউন্সিলর আলবার্তো জিওভানেত্তি উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষ হওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ‘ইউনাইটেড নেশনস অফিস অন ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইম’ (ইউএনওডিসি)-এর দক্ষিণ এশীয় বিষয়ক আঞ্চলিক পরিচালক ক্রিস্টিয়ান হোলজের সঙ্গে একটি পৃথক বৈঠকে মিলিত হন।
এই সাক্ষাৎকারটি বাংলাদেশ ও সুইজারল্যান্ডের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।



