ভারতের অর্থসহায়তায় ইউনূস সরকারের আমলে সর্বনিম্ন
গত এক যুগে বাংলাদেশকে প্রায় ১ হাজার ৫৫৭ কোটি রুপির অর্থসহায়তা দিয়েছে ভারত। তবে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গত ১২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম অর্থসহায়তা এসেছে। গত শুক্রবার ভারতের লোকসভা অধিবেশনে এক প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং এই তথ্য জানিয়েছেন।
সহায়তার হিসাব ও প্রবণতা
লোকসভার সদস্য টি আর বালু ২০১৪–১৫ অর্থবছর থেকে বর্তমান পর্যন্ত বাংলাদেশকে দেওয়া সহায়তার পরিমাণ জানতে চাইলে, লিখিত উত্তরে অর্থসহায়তার হিসাব দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, এই হিসাবে ভারতের লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি) আওতায় আসা অর্থ বাদ দেওয়া হয়েছে।
২০১৪–১৫ অর্থবছরে ভারত প্রায় ১৯৮ কোটি রুপি দিয়েছিল, কিন্তু সর্বোচ্চ অর্থ এসেছে ২০২১–২২ অর্থবছরে, যখন ২১৯ কোটি ৫৩ লাখ রুপি দেওয়া হয়। এরপর সহায়তা কমতে শুরু করে এবং ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা ৫৯ কোটি রুপিতে নেমে আসে। ওই বছরই গণ–অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয় এবং শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর গঠিত হয় অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তীব্র পতন
নানা ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হওয়ায়, দ্বিপক্ষীয় অর্থসহায়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত, যা ভারতের অর্থবছরের ১১ মাসের হিসাব, মাত্র ২৫ কোটি রুপি আসে। গত পাঁচ বছরের ব্যবধানে ভারতীয় অর্থসহায়তা আট ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে, যা গত এক যুগের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ভারতের বক্তব্য ও প্রতিশ্রুতি
লোকসভায় কীর্তি বর্ধন সিং বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত ও বাংলাদেশের গভীর ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক, ভাষাগত এবং সামাজিক সম্পর্ক আছে। একটি গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের প্রতি ভারত ধারাবাহিকভাবে সমর্থন প্রকাশ করেছে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ভারত এলওসি ও অনুদানের মাধ্যমে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগে সহায়তা প্রদান করেছে, পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়ন, মানবিক সহায়তা, দুর্যোগ ত্রাণ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিমূলক কর্মসূচিতে সহায়তা করেছে।
এলওসির অবস্থা ও প্রকল্প
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, গত জানুয়ারি মাস পর্যন্ত ভারত সব মিলিয়ে এলওসির আওতায় ২১০ কোটি ডলার ছাড় করেছে। ২০১০, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে তিনটি এলওসিতে বাংলাদেশকে মোট ৭৩৬ কোটি ডলার ঋণ প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, প্রতিশ্রুতির পরও কাঙ্ক্ষিত হারে অর্থছাড় হয়নি।
- প্রথম এলওসিতে ১০০ কোটি ডলার দেওয়া হয়, যার ১৫টি প্রকল্পের মধ্যে ১২টি শেষ হয়েছে এবং ৩টি চলমান।
- দ্বিতীয় এলওসির ১৫টি প্রকল্পের মধ্যে ২টি শেষ হয়েছে, ১০টি চলমান এবং ৩টি প্রস্তাবনা পর্যায়ে আছে।
- তৃতীয় এলওসির ১৩টি প্রকল্পের মধ্যে ৮টি চলমান আছে এবং বাকি ৫টি প্রস্তাবনা পর্যায়ে আছে।
ইআরডির একজন কর্মকর্তা জানান, অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর ভারতীয় ঋণের ছাড় কমেছিল, তবে নতুন সরকার আসার পর এলওসির আওতায় প্রকল্পগুলোর অর্থ ছাড়ে সমস্যা কোথায়, তা নিয়ে পর্যালোচনা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
কীর্তি বর্ধন সিং আরও বলেন, ভারতীয় বন্দরগুলোতে দেওয়া সুবিধার বিষয়ে বাংলাদেশ নিজস্ব রপ্তানিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট সব বিষয় বিবেচনা করে নীতিতে যেকোনো পরিবর্তনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘দ্বিপক্ষীয় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার অধীনে উচ্চপর্যায়ের বিনিময় ও বৈঠক অব্যাহত রাখতে ভারত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
সামগ্রিকভাবে, ভারতের অর্থসহায়তার এই প্রবণতা বাংলাদেশ–ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বর্তমান গতিপ্রকৃতি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অর্থনৈতিক সহযোগিতার হ্রাসকে স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে।



