ভুট্টোর মিথ্যাচার: ফালাচির সাক্ষাৎকারে উন্মোচিত ১৯৭২ সালের অপ্রকৃতিস্থতা
ভুট্টোর মিথ্যাচার: ফালাচির সাক্ষাৎকারে উন্মোচিত

ভুট্টোর মিথ্যাচার: ফালাচির সাক্ষাৎকারে উন্মোচিত ১৯৭২ সালের অপ্রকৃতিস্থতা

‘কনজেনিটাল লায়ার’ বা জন্মমিথ্যুক শব্দটি জুলফিকার আলী ভুট্টোর জন্য যথার্থ বলে প্রমাণিত হয়েছে। ১৯৭২ সালের এপ্রিলে ইতালীয় সাংবাদিক ওরিয়ানা ফালাচির কাছে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে ভুট্টোর মিথ্যাবাদী ও অপ্রকৃতিস্থ চরিত্র স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এই সাক্ষাৎকারটি ‘ইন্টারভিউ উইথ হিস্ট্রি’ সংকলনের অংশ, যা বিশ্বব্যাপী আলোচিত।

বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে বিষোদ্গার

ভুট্টোর সাক্ষাৎকারের প্রায় পুরোটাই বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে বিষোদ্গারে পূর্ণ। তিনি মুজিবকে মিথ্যাবাদী বলে আধডজনবার উল্লেখ করেছেন এবং ১৯৭১ সালের গণহত্যাকে অস্বীকার করে বলেছেন, ‘একাত্তরে বাংলাদেশে কোনো গণহত্যা হয়নি!’ জেরার মুখে তিনি স্বীকার করেছেন যে মাত্র পঞ্চাশ হাজার লোক মারা গেছে, এবং এই গণহত্যাকে জাতীয় ঐক্যের জন্য ন্যায্য বলে ব্যাখ্যা করেছেন।

তিনি বঙ্গবন্ধুকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে ইয়াহিয়া খানের দোসর বা নিজের বশংবদ নাবালক রাজনৈতিক এজিটেটর হিসেবে চিত্রিত করেছেন। মিয়ানওয়ালির বন্দিশালায় তাঁর জন্য খননকৃত গোরকে তিনি একটি বম্ব শেল্টার বলে দাবি করেছেন, যা তাঁর মিথ্যাচারের আরেকটি উদাহরণ।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অপ্রকৃতিস্থতা ও রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি

ভুট্টোর এই সাক্ষাৎকার ১৯৭২ সালে একটি বড় রাজনৈতিক কেলেঙ্কারির সৃষ্টি করেছিল, মূলত ইন্দিরা গান্ধী সম্পর্কে তাঁর অশালীন মন্তব্যের কারণে। ফালাচি ইন্দিরার সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর ভুট্টো ক্ষুব্ধ হয়ে সরকারি খরচে রাওয়ালপিন্ডিতে ছয় দিন থেকে পাল্টা সাক্ষাৎকার দেন, যেখানে তিনি ইন্দিরাকে নির্মমভাবে আক্রমণ করেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এরপর ভুট্টো ফালাচিকে চাপ দিয়ে বলতে বাধ্য করতে চেয়েছিলেন যে এই সাক্ষাৎকারটি কাল্পনিক, বিশেষ করে ইন্দিরা সম্পর্কে মন্তব্যগুলো উদ্ভাবিত। ফালাচি এই চাপ অস্বীকার করলে ভুট্টোর রাষ্ট্রদূতরা তাঁর পিছু ছাড়েননি, এমনকি ছয় কোটি মানুষের ভাগ্য নিয়ে হুমকিও দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ইন্দিরা গান্ধীই চুক্তি স্বাক্ষর করে এই সংকট নিরসন করেন।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও মানসিকতা বিশ্লেষণ

ভুট্টোর সাক্ষাৎকারটি এখন ঐতিহাসিক দূরত্ব থেকে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন দুটি কারণে:

  • প্রথমত, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি শাসকদের মানসিকতা বোঝার জন্য, যারা বাঙালিদের সমমর্যাদাসম্পন্ন মনে করেনি এবং গণহত্যাকে ন্যায্য বলে মনে করত।
  • দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানিদের মধ্যে এই খুনে মানসিকতার কোনো পরিবর্তন ঘটেছে কিনা তা মূল্যায়নের জন্য, যা বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।

ভুট্টো নিজেকে বামপন্থী বা মাওবাদী বলে দাবি করলেও বাঙালিদের মুক্তির প্রতি কোনো সহানুভূতি দেখাননি। বরং তিনি বাঙালিদের হতচ্ছাড়া, দারিদ্র্যক্লিষ্ট এবং ঢাকাকে আঁধারঘেরা নোংরা শহর বলে উল্লেখ করেছেন। আজ পর্যন্ত কেউ তাঁর এই ঔদ্ধত্যের জন্য ক্ষমা চায়নি, যা ঐতিহাসিক সত্যকে উপেক্ষারই প্রতিফলন।

সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশের প্রতিফলন

সাক্ষাৎকারে ভুট্টো বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বলেছেন, ‘মুজিব একটা আজন্ম মিথ্যুক... লোকটা পাগল, আস্ত পাগল।’ তিনি গণহত্যার সংখ্যা কমিয়ে দেখিয়েছেন এবং একে নীতিসম্মত বলে দাবি করেছেন, যুক্তি দিয়ে বলেছেন যে দেশ গড়তে স্টালিন বা মাও সেতুংকেও বলপ্রয়োগ করতে হয়েছিল।

বাংলাদেশকে তিনি ভারতের স্যাটেলাইট রাজ্য বলে অভিহিত করেছেন এবং ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে মুজিব দীর্ঘদিন টিকতে পারবেন না। তাঁর মতে, বাংলাদেশের ভাগ্য খারাপ এবং দেশটি সারা বিশ্বের তলানিতে অবস্থিত।

এই সাক্ষাৎকারটি ভুট্টোর মিথ্যাচার, অহংকার এবং ঐতিহাসিক বিকৃতির একটি জীবন্ত দলিল, যা পাকিস্তানি শাসকদের মানসিকতা ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট বুঝতে সহায়তা করে।