ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন অধ্যায়: ইতিবাচক মনোভাব ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পালাবদলের পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে ভারত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিল, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের আলোচনা শুরু হবে দেশটির নির্বাচিত সরকারের সঙ্গেই। গত ১২ ফেব্রুয়ারির উৎসবমুখর নির্বাচনের পরপরই সেই উদ্যোগ দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। গত দেড় বছরের সম্পর্কের নিরিখে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দুই দেশের সরকারি মানসিকতা এখন সম্পূর্ণরূপে ইতিবাচক। ঢাকা বা নয়াদিল্লি—কোনো পক্ষ থেকেই এমন কোনো বেফাঁস মন্তব্য করা হয়নি, যা সম্পর্কের উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
রাজনৈতিক স্তরে সংযম ও কৌশলগত বাস্তববাদিতা
রাজনৈতিক পর্যায়েও এমন কোনো উস্কানিমূলক বক্তব্য শোনা যায়নি, যা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্থাপনে সন্দেহের জন্ম দিতে পারে। বরং সরকার ও রাজনৈতিক মহলের মন্তব্য অথবা মন্তব্যহীনতায় এটাই প্রতিভাত হয় যে, দুই দেশই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিরীক্ষণে আগ্রহী। নির্বাচন-পরবর্তী অধ্যায় সম্পর্কে সংক্ষেপে বলা যায়, ‘সো ফার সো গুড’ বা এ পর্যন্ত সবকিছু ভালোই চলছে।
গত দেড় বছরে ভারতের আচরণের মধ্য দিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। প্রথমত, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের দাবি ভারত মানবে না, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক শুধুমাত্র হাসিনা-জটে আটকে থাকবে। ভারত বোঝাতে চাইছে, হাসিনা-অধ্যায় আপাতত অতীত, এবং সেই পর্ব পেরিয়ে আগামী দিনের আলোয় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে দেখতে হবে।
মনোভাব বদলের স্পষ্ট ইঙ্গিত
দ্বিতীয়ত, সাম্প্রতিক কালের ভারতীয় আচরণ এটাও নির্দেশ করছে যে, সম্পর্কটি ঐতিহাসিক এবং তা দুই দেশের মানুষের সঙ্গে মানুষের। এটি কোনো বিশেষ সরকার বা দলকেন্দ্রিক নয়। পরোক্ষভাবে ভারত বোঝাতে চাইছে, অতীতে সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখার ভুল শোধরানোর চেষ্টা শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালের একতরফা নির্বাচনের সময় থেকে, যা অভ্যুত্থানের পর আরও গতি পেয়েছে।
তৃতীয়ত, ভারত এটাও বোঝাতে চেয়েছে যে, ভূরাজনৈতিক কারণ ও ভৌগোলিক অবস্থানের দরুন দুই দেশের মধ্যে সখ্য থাকা অত্যন্ত জরুরি। সুপ্রতিবেশীসুলভ মনোভাব, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সক্রিয় সহযোগিতা দুই দেশের পক্ষেই অত্যাবশ্যক। সদ্ভাব প্রয়োজন পারস্পরিক স্বার্থের জন্যই।
অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার গুরুত্ব
‘গ্লোবাল সাউথ’-এর প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে মাথাচাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে নিশ্চিত নিরাপত্তা যদি ভারতের প্রথম শর্ত হয়, তাহলে বাংলাদেশের জন্য জরুরি হলো দেশকে আবার আর্থিক প্রবৃদ্ধির রথে ফিরিয়ে আনা। ২০২৩ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ১ শতাংশ থেকে আড়াই শতাংশ কমে গেছে এবং প্রায় ২১ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছেন। হাত ধরাধরি করে এগোনো দুই দেশের পক্ষেই এখন অপরিহার্য।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে নিশ্চিত থাকা ভারতের জন্য যতটা প্রয়োজন, বাংলাদেশের পক্ষে ততটাই আবশ্যক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে হাঁটা। মনোভাব বদলের ইঙ্গিত দুই পক্ষ থেকেই আসছে, যা সম্পর্কের উন্নয়নে ইতিবাচক সংকেত দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ও ইতিবাচক পদক্ষেপ
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর জানাজায় অংশগ্রহণের জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করকে ঢাকায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় ভারত। জয়শঙ্করের হাত দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একটি চিঠিও পাঠান তারেক রহমানের কাছে। সেই চিঠিতে গভীর শোক প্রকাশ করে মোদি লেখেন, তাঁর আশা, ‘তারেক রহমানের নেতৃত্ব ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে গভীর ঐতিহাসিক অংশীদারত্বের নতুন সূচনা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে।’
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের শপথ গ্রহণ উপলক্ষে ভারতীয় সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার ঢাকা সফরও সম্পর্ক উন্নয়নের দিকে আরেকটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে ভারতের আগ্রহের আরও একটি নজির স্থাপিত হয় বাজেট অধিবেশন শুরুর দিন, যখন সংসদের দুই কক্ষেই বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।
বিএনপির ইতিবাচক মনোভাব ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
সম্পর্কের তালি একতরফা বাজে না। বাস্তবতা অনুধাবনে ইতিবাচক মনোভাবের ইঙ্গিত বিএনপিও দিয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে থাকাকালে পশ্চিমি গণতন্ত্রকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন তারেক রহমান। সেই নিরীক্ষণ তাঁকে পরিণত, শালীন, বিচক্ষণ, অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টা, বৈষম্যবিরোধী ছাত্রসমাজ ও এনসিপি নেতারা তীব্র ভারতবিরোধিতায় মুখর হলেও তারেক রহমান কিংবা দলের শীর্ষ নেতারা সে রাস্তায় হাঁটেননি।
বরং বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তারেককে বলতে শোনা গেছে, দেশের মাটিকে সন্ত্রাসবাদীদের বিচরণভূমি হতে দেবেন না। ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধেও তিনি সুর চড়িয়েছেন। বারবার বলেছেন, অতীতের ভুলভ্রান্তি থেকে শিক্ষা নিয়ে সবাইকে সঙ্গে করে নতুনভাবে দেশ গঠনের দিকে এগোবেন, যেখানে সবার পরিচয় হবে ‘বাংলাদেশি’।
নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দ্রুত পদক্ষেপ
নির্বাচনের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদিও সময় নষ্ট না করে অভিনন্দন জানিয়েছেন বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে। বার্তা পাঠানোর পাশাপাশি ফোনও করেছেন। এই পদক্ষেপই বোঝায় ভারতের কাছে ভোটের ফল কতটা স্বস্তিদায়ক। ইতিবাচক ঘটনাপ্রবাহ অব্যাহত রয়েছে দুই তরফেই।
সরকার গঠিত হওয়ার পরপরই ভারতে এসেছেন বাংলাদেশের নবনিযুক্ত ডিরেক্টর জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই) মেজর জেনারেল মোহাম্মদ কায়সার রশিদ চৌধুরী। তিন দিনের সফরে তিনি বৈঠক করেছেন ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈন এবং মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের মহাপরিচালক আর এস রমণের সঙ্গে।
জ্বালানি ও ভিসা ইস্যুতে সহযোগিতা
ইতিবাচক মনোভাবের নবতম ইঙ্গিত পাওয়া যায় বাংলাদেশের ডিজেল চাহিদার ক্ষেত্রে। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ জ্বালানি-সংকট বাড়িয়েছে। এ অবস্থায় ভারতের মুখাপেক্ষী বাংলাদেশ। নুমালিগড় শোধনাগার থেকে পাইপলাইন মারফত বাড়তি ডিজেল চেয়েছে বাংলাদেশ। ভারত জানিয়েছে, অনুরোধ বিবেচনাধীন। ভারতের দিকে বাংলাদেশ তাকাতে না-ও পারত, ভারতও অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারত। কোনোটাই কিন্তু হয়নি।
বাংলাদেশের নাগরিকদের কাছে ভারতের ভিসা প্রাপ্তি অতি গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা। পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার অর্থনীতিও অনেকটাই বাংলাদেশি পর্যটকনির্ভর। দেড় বছর ধরে সহজে ভারতের ভিসা পাওয়ার পথ বন্ধ থাকলেও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভিসা স্বাভাবিক করার কথা ভারত নতুনভাবে ভাবছে। দুই দেশই জানে, সম্পর্ক ধীরে ধীরে ভালো হওয়াই মঙ্গল।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
আপাতত সব ইঙ্গিত ইতিবাচক। দুই পক্ষের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সংযম এবং কৌশলগত বাস্তববাদিতার অনুধাবন দ্বিপক্ষীয় স্বার্থের খাতিরে জরুরি। দুই দেশ সেই লক্ষ্যে অবিচল থাকতে পারবে কি না, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দূরদৃষ্টি ও বিচক্ষণতার ওপর। আপাতত বলা যায়, ‘সো ফার সো গুড’ বা এ পর্যন্ত সবকিছু ভালোই চলছে, কিন্তু ভবিষ্যতে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উভয় পক্ষের সতর্কতা ও সহযোগিতা অপরিহার্য হবে।
