সার্কের পুনরুজ্জীবনে প্রধানমন্ত্রীর সক্রিয় উদ্যোগ
দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্ক ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়, যার মাধ্যমে সাতটি দেশের জোটটি সাংগঠনিক কাঠামো পায়। ২০০৭ সালে আফগানিস্তানের সদস্যপদ লাভের পর জোটটির সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় আটটিতে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আঞ্চলিক সমন্বয়ের লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করা এই জোট গত প্রায় ১১ বছর ধরে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সার্ক পুনরায় সচল করার কথা বললেও কার্যত কোনও উদ্যোগ নিতে পারেননি। তবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এখন সেই চেষ্টা শুরু করেছেন। তার নির্দেশে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করছে।
সার্কের নিষ্ক্রিয়তার পেছনের কারণ
সার্কের সর্বশেষ শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালে নেপালের কাঠমান্ডুতে। এরপর ২০১৬ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক হয় দেশটির পোখরা শহরে। এখন পর্যন্ত সার্কের ১৮টি শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নেপালের সম্মেলনের পর ২০১৬ সালের নভেম্বরে পাকিস্তানে সার্কের ১৯তম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তবে কাশ্মিরের উরির সেনাঘাঁটিতে সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদে সম্মেলন বয়কট করে ভারত। এই বয়কটের সঙ্গে যোগ দেয় বাংলাদেশ, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ। এরপর থেকে দক্ষিণ এশিয়ার এই জোট অকার্যকর হয়ে পড়ে।
বিমসটেকের উত্থান ও সার্কের তুলনা
কূটনীতিকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক জোটের নতুন মেরুকরণ আলোচনায় আসে ১৯৯৭ সালে। ওই বছর প্রতিষ্ঠা পায় বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে বহু খাতভিত্তিক কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতামূলক উদ্যোগ— বিমসটেক। এর সদস্য দেশগুলো হলো—বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড। সার্কের সদস্য পাকিস্তান, মালদ্বীপ, আফগানিস্তান এই জোটে নেই। ভারতে নরেন্দ্র মোদি দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা নেওয়ার সময় ২০১৯ সালের শপথ অনুষ্ঠানে সার্ক বাদ দিয়ে বিমসটেক সদস্যদের আমন্ত্রণ জানান। তাতে বিমসটেকের সঙ্গে সার্কের এবং একই সঙ্গে ভারতের দূরত্ব প্রকাশ্য দেখা দেয়। তবে কূটনীতিকরা বিমসটেকের সঙ্গে সার্কের তুলনা করতে চান না। তাদের মতে, সার্ক দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর আঞ্চলিক জোট, বিমসটেক বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে।
ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বের প্রভাব
সাবেক কূটনীতিকদের মতে, সার্ক নিষ্ক্রিয় হওয়ার পেছনে মূল কারণ ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব। ঢাকার সাবেক একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বলেন, “ভারত পাকিস্তানের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব আছে তাতে সার্ক পুনরুজ্জীবিত করার সম্ভাবনা নেই। দুই দেশের উত্তেজনার মধ্যে এক টেবিলে আলোচনার পরিবেশ তৈরি হওয়া সম্ভব না। সেখানে তৃতীয় কোনও দেশের উদ্যোগ নিতে হবে। সেটা বাংলাদেশ করতে পারে। কিন্তু এই অঞ্চলে সার্কের সচল হওয়াতে ভারতের সদিচ্ছা জরুরি।” তিনি আরও বলেন, “সার্ক সক্রিয় হলে শুধু বাংলাদেশ না—সদস্য রাষ্ট্র সবাই একসঙ্গে শক্তিশালী হবে। এতে ভারতেরও লাভ আছে। কিন্তু সদিচ্ছা থাকা জরুরি।”
প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট বার্তা ও পদক্ষেপ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনে জয়লাভের পরপরই সংবাদ সম্মেলনে সার্ক পুনরায় সচল করার বার্তা দিয়েছেন। সেই অনুযায়ী তিনি একটি পরিষ্কার ধারণা দেন কূটনীতিকদের নিয়ে আয়োজিত ইফতার মাহফিলে। সেখানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত এবং তাদের স্ত্রীরা অংশ নেন। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে একই টেবিলে বসেন সার্কভুক্ত দেশের রাষ্ট্রদূতরা। তাদের মধ্যে ছিলেন ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মা, নেপালের রাষ্ট্রদূত ঘনশ্যাম ভান্ডারী, ভুটানের রাষ্ট্রদূত দাশো কারমা হামু দর্জি, পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দার ও শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রদূত ধর্মপাল বীরাককোডি এবং তাদের স্ত্রীরা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎপরতা
সার্ক সচল করার বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন মহাসচিব মো. গোলাম সারওয়ার। তিনি বৈঠক শেষে বলেছিলেন, সার্কের বিষয়ে জানতে চেয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সার্ক মহাসচিব আরও বলেন, “আঞ্চলিক সংস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করতে বর্তমান সরকার যে পদক্ষেপ নেবে তা সার্ক সচিবালয়ের মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোকে জানানো হবে।” তিনি আরও বলেন, “একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করতে বাংলাদেশ কীভাবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।”
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সার্ক নিয়ে পরিকল্পনা চলছে। মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ঈদের পর কাজ শুরুর প্রাথমিক পর্যায়ে আছে পরিকল্পনা। তবে বর্তমানে মূল ফোকাস জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের নির্বাচন। এর পাশাপাশি সার্ক নিয়েও আলোচনা চলছে। সার্কের সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে বৈঠক আহ্বান করা হতে পারে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
কূটনৈতিক সূত্র বলছে, সার্ক সচল করার উদ্যোগটি শুরু হতে পারে দিল্লি থেকে। ঈদের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান দিল্লি সফর করতে পারেন। সেখান থেকেই মূলত উদ্যোগ শুরু করার প্রাথমিক পরিকল্পনা আছে। তবে তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা বলেন, “সরকার সার্ক পুনরুজ্জীবিত করতে আগ্রহী। আঞ্চলিক সহযোগিতা এক্ষেত্রে খুবই জরুরি।” সার্কের পুনরুজ্জীবন দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, তবে ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
