ভারত থেকে জ্বালানি তেল আমদানি বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক অনুরোধ
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি তেল আমদানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বাংলাদেশ সরকার চুক্তির বাইরে নতুন উৎস খুঁজছে। এ প্রেক্ষাপটে ভারত থেকে বাড়তি জ্বালানি তেল আমদানির আগ্রহ প্রকাশ করে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আজ বুধবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মার সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়, যেখানে দুই দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পারস্পরিক সহায়তা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
মন্ত্রীর বক্তব্য ও চিঠি প্রেরণের নিশ্চয়তা
সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, ভারত সরকারকে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি তেল আমদানি করা হয় এবং বর্তমান আপত্কালীন পরিস্থিতিতে এ সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে অনুরোধ করা হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, "কতটুকু বাড়াতে পারে, তারা (ভারত) সিদ্ধান্ত দেবে। তারা দিলে বোঝা যাবে, কতটুকু বেড়েছে।" এর ফলে ডিজেল সরবরাহ বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ভারতীয় হাইকমিশনারের প্রতিক্রিয়া
সৌজন্য সাক্ষাতের পর ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মা সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল সরবরাহের আনুষ্ঠানিক অনুরোধের চিঠি গ্রহণ করা হয়েছে এবং এটি ভারত সরকারের কাছে তুলে ধরা হবে। তিনি উল্লেখ করেন যে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিন ধরে সহায়তার সম্পর্ক বিদ্যমান। বাংলাদেশ নিয়মিত ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করে, পাশাপাশি পাইপলাইন ও সমুদ্রপথে জ্বালানি তেল আমদানি করে থাকে। এছাড়া ভারতের মধ্য দিয়ে নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানিও করা হয়।
বিদ্যমান চুক্তি ও সরবরাহ পরিস্থিতি
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র অনুযায়ী, ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেডের সঙ্গে ২০১৭ সালের ২২ অক্টোবর পাইপলাইনে ডিজেল আমদানির চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ২০২৩ সালের মার্চে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়। চুক্তি অনুসারে এ বছর ১ লাখ ২০ হাজার টন ডিজেল আসার কথা, যার বাইরে অতিরিক্ত ৬০ হাজার টন দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিবার ৫ হাজার টন করে ডিজেল সরবরাহ করা হয় এবং গতকাল পর্যন্ত দুই ধাপে ১০ হাজার টন এসেছে।
- ভারতের ইন্ডিয়ার অয়েল কোম্পানি লিমিটেড (আইওসিএল) ২০২০ সাল থেকে বিপিসির কাছে তেল সরবরাহ করছে।
- ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ১ লাখ ৫ হাজার টন তেল আসার পরিকল্পনা রয়েছে, যার মধ্যে ডিজেল ২০ হাজার টন, ফার্নেস ৫০ হাজার টন, অকটেন ২৫ হাজার টন ও জেট ফুয়েল ১০ হাজার টন অন্তর্ভুক্ত।
- আইওসিএল সমুদ্রপথে এ জ্বালানি তেল সরবরাহ করে থাকে।
বৈশ্বিক সংকট ও অতিরিক্ত আমদানির প্রস্তাব
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষিতে ৮ মার্চ জ্বালানি বিভাগের কাছে ভারত থেকে তেল আমদানি বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠায় বিপিসি। প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়:
- মার্চ মাসে ৪ ধাপে ২০ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ করা যেতে পারে।
- এপ্রিল মাসে ৫ ধাপে ২৫ হাজার টন ডিজেল সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে।
- পরবর্তী মাসগুলোতেও একই হারে আমদানি বাড়ানো যেতে পারে।
- দূরত্ব বিবেচনায় ভারত থেকে সমুদ্রপথে ৩০ হাজার টন করে চারটি জাহাজে ১ লাখ ২০ হাজার টন ডিজেল সরবরাহের অনুরোধ করা যেতে পারে।
সরকার জ্বালানি তেল আমদানির উৎস বাড়াতে সক্রিয় রয়েছে, যাতে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধজনিত অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও দেশের চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়। এই উদ্যোগ দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন।
