বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য অংশীদারিত্ব: সমুদ্র অর্থনীতি ও এভিয়েশন হাব গঠনে ঐতিহাসিক অগ্রগতি
বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে আঞ্চলিক এভিয়েশন শক্তি এবং বিলিয়ন ডলারের সমুদ্র অর্থনীতি বা ব্লু-ইকোনমি অংশীদারিত্বের নতুন মাইলফলকে পৌঁছেছে। লন্ডনে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর এই কৌশলগত অগ্রগতির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
লন্ডনে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত
লন্ডনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী স্যার ক্রিস ব্রায়ান্ট এমপির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ হাইকমিশন লন্ডনের প্রেস মন্ত্রী আকবর হোসেন সোমবার রাতে এক প্রেস রিলিজে জানান, চলতি মাসে ক্যামেরুনে অনুষ্ঠিতব্য ১৪তম ডব্লিউটিও মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনের আগেই এই অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।
এই বৈঠকে বাংলাদেশের ২০২৬ সালের এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যুক্তরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার বিষয়ে সম্মতি প্রকাশ করা হয়েছে। দুই দেশ সাহায্য-নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে শক্তিশালী বাণিজ্যিক ও শিক্ষাভিত্তিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে আইনি কাঠামো আধুনিকায়নের বিষয়েও একমত হয়েছে।
সমুদ্র অর্থনীতিতে যুগান্তকারী বিনিয়োগের সম্ভাবনা
বৈঠকে প্রথাগত বাণিজ্যের গণ্ডি পেরিয়ে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডকে উন্নত প্রযুক্তি ও সামুদ্রিক খাতে সম্প্রসারণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ব্লু-ইকোনমি বা সমুদ্র অর্থনীতিতে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে আগ্রহী যুক্তরাজ্য।
বিশেষ করে সামুদ্রিক বায়োটেকনোলজি এবং গভীর সমুদ্রের সম্পদ ব্যবস্থাপনায় ব্রিটিশ কারিগরি সহায়তা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই উদ্যোগ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ঢাকাকে এভিয়েশন হাবে রূপান্তরের পরিকল্পনা
যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য দূত ব্যারনেস রোজি উইন্টারটনের সঙ্গে এক বিশেষ অধিবেশনে ঢাকাকে ইউরোপ-এশিয়া ট্রানজিটের কৌশলগত স্টপওভার হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সম্প্রসারণকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ অ্যারোস্পেস অভিজ্ঞতা ও উন্নত গ্রাউন্ড-হ্যান্ডলিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঢাকাকে দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান এভিয়েশন হাবে রূপান্তরিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় পরবর্তী প্রজন্মের এভিয়েশন পেশাদার তৈরিতে একটি বিশেষ সক্ষমতা বৃদ্ধি কর্মসূচিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই উদ্যোগ বাংলাদেশের পরিবহন খাতের উন্নয়নে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে বিশ্লেষকরা মত দিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক আইন ও বাণিজ্য সংহতির প্রতিশ্রুতি
বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রে দুই দেশের সংহতি লক্ষ্য করা গেছে। প্রতিনিধি দল ২০২৭-২০৩৬ মেয়াদের জন্য আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইজেসি) ব্রিটিশ মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক ডাপো আকান্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।
ডব্লিউটিও সম্মেলনে বহুপাক্ষিক বাণিজ্য বিধি এবং বাংলাদেশের বাজার সুবিধার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে উভয় দেশ একাত্মভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের বৈশ্বিক বাণিজ্যিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্যের এই নতুন অংশীদারিত্ব কেবল অর্থনৈতিক সহযোগিতা নয়, বরং কৌশলগত সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে, যা ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে আরও গভীর ও বহুমুখী সহযোগিতার পথ প্রশস্ত করবে।
