ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুতে ভারতের কূটনৈতিক শোক প্রকাশ, পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা
ইরানের নেতার মৃত্যুতে ভারতের শোক, পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুতে ভারতের কূটনৈতিক শোক প্রকাশ, পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা

পশ্চিম এশিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাওয়ার মধ্যেই ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুতে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছে। বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লিতে অবস্থিত ইরানের দূতাবাসে গিয়ে শোক প্রকাশ করেন ভারতের বিদেশ সচিব বিক্রম মিস্রী। তিনি ইরানি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে শোকবার্তা পৌঁছে দেন এবং দূতাবাসে রাখা শোকপুস্তিকায় স্বাক্ষর করেন।

পশ্চিম এশিয়ায় জটিল পরিস্থিতি

গত কয়েক দিন ধরে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। গত শনিবার থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের যৌথ সামরিক হামলা শুরু হয় ইরানের বিভিন্ন স্থানে। সেই হামলার মধ্যেই নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা খামেনি। রোববার তেহরান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে। এরপর থেকেই পুরো অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে এই ঘটনাকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় রাজনৈতিক মোড় বলে মনে করা হচ্ছে।

খামেনির মৃত্যুর খবর সামনে আসার পর একাধিক দেশে প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। ইরানও পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নিতে শুরু করে। পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলার খবর সামনে আসে। সংযুক্ত আরব আমিরসহ কাতার, বাহরিন, সৌদি আরব এবং কুয়েতের আকাশসীমায় ইরানের ড্রোন ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে। এই পরিস্থিতিতে গোটা অঞ্চলে যুদ্ধের আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়।

ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান

এই অস্থির পরিস্থিতির মধ্যেই ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ নজর ছিল। কারণ ভারত একদিকে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে পরিস্থিতির প্রতি দিল্লি কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায় তা নিয়ে আগ্রহ ছিল কূটনৈতিক মহলে।

এই প্রেক্ষাপটে নয়াদিল্লিতে ইরানের দূতাবাসে বিদেশ সচিব বিক্রম মিস্রীর উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। তিনি ইরানি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ভারতের পক্ষ থেকে শোকজ্ঞাপন করেন। শোকপত্রে স্বাক্ষর করে ভারত সরকারের সমবেদনা জানান। কূটনৈতিক মহলে এই পদক্ষেপকে প্রতীকী হলেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ এই মুহূর্তে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর।

এদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইতোমধ্যেই একাধিক আন্তর্জাতিক নেতার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন বলে জানা গেছে। সংঘাত বাড়তে থাকায় শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ভারত সব সময় আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের পক্ষেই রয়েছে বলে বারবার জানিয়েছে দিল্লি।

অভ্যন্তরীণ বিতর্ক ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

তবে এই ঘটনার পর ভারতের অবস্থান নিয়ে দেশের অভ্যন্তরেও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। বিরোধী নেতারা প্রশ্ন তুলেছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু নিয়ে ভারত সরকার প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে না কেন। সেই বিতর্কের মধ্যেই বিদেশ সচিবের এই পদক্ষেপ অনেকের মতে পরিস্থিতিকে নতুন দিকে নিয়ে যেতে পারে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও এই ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে। ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য হিন্দু এবং দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়ছে, পশ্চিম এশিয়ার দ্রুত বদলে যাওয়া পরিস্থিতির মধ্যে দিল্লি অত্যন্ত সতর্ক কূটনৈতিক অবস্থান নিচ্ছে। একইসঙ্গে সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে ভারত এই সংঘাতে সরাসরি কোনো পক্ষ না নিয়ে শান্তির পক্ষে অবস্থান বজায় রাখতে চাইছে।

অতিরিক্ত ঘটনা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাতের মধ্যে আরেকটি ঘটনাও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনায় এসেছে। শ্রীলঙ্কার উপকূলের কাছে ভারতমুখী একটি ইরানি জাহাজ মার্কিন নৌবাহিনীর টর্পেডো হামলায় ধ্বংস হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে। যদিও এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। তবু এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

এই সংঘাতের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং খুব শিগগিরই যুদ্ধ থামার সম্ভাবনা নেই। তার এই মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।

এই পরিস্থিতিতে ভারত যে কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে তা স্পষ্ট। একদিকে শান্তির আহ্বান অন্যদিকে ইরানের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে এই ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন ভারতের কূটনৈতিক কৌশলের মূল লক্ষ্য। ভারতের এই পদক্ষেপ পশ্চিম এশিয়ার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।