ইরান ইস্যুতে বাংলাদেশের বিবৃতি নিয়ে সমালোচনার ঝড়: কেন উল্লেখ নেই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের নাম?
ইরান ইস্যুতে বাংলাদেশের বিবৃতি নিয়ে সমালোচনা

ইরান ইস্যুতে বাংলাদেশের বিবৃতি নিয়ে সমালোচনার ঝড়

মার্চ ২০২৬-এ সংঘটিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানসহ উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিরা নিহত হন। এই হামলায় শুধুমাত্র তেহরানেই অন্তত ৫৭ জন নাগরিক প্রাণ হারান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনার পর ইরান পাল্টা হামলা চালিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে, যার মধ্যে বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত অন্তর্ভুক্ত।

বাংলাদেশের বিবৃতি ও বিতর্কের সূত্রপাত

এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ১ মার্চ রোববার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। বিবৃতিতে ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের ঘটনার নিন্দা জানানো হয়। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের নাম উল্লেখ করা হয়নি এবং ইরানে সংঘটিত প্রাথমিক হামলার বিষয়েও কোনো নিন্দা বা মন্তব্য করা হয়নি।

বিবৃতিটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির অবস্থান নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়। বিবিসি বাংলার খবর অনুযায়ী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে সাফল্য পাওয়া যায়নি।

কূটনীতিক বিশ্লেষকদের তীব্র প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই অবস্থানকে ‘একপেশে’ বলে বর্ণনা করেছেন অনেক কূটনীতিক বিশ্লেষক ও সাবেক কূটনীতিকরা। সাবেক কূটনীতিক মুন্সি ফয়েজ আহমেদ তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, “এ ধরনের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত হওয়া উচিত ছিল। আমরা জানি না এই বিবৃতি কী কারো চাপে পড়ে দিয়েছে, নাকি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিজে থেকেই দিয়েছে।”

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক সাহাব এনাম খান তার মূল্যায়নে বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানে আগ্রাসনের বিরোধিতা এবং আন্তর্জাতিক বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের কথা বলা আছে। তিনি মনে করেন, “এই ইস্যুতে বর্তমান সরকারের উচিত ছিল বিবৃতিতে সব পক্ষের নাম উল্লেখ করা। একই সাথে দুই পক্ষের হামলার নিন্দা জানানো। কিন্তু সেটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় করেনি।”

বিবৃতির মূল বক্তব্য ও নিরাপত্তা উদ্বেগ

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে চলমান শত্রুতাকে আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং বেসামরিক জনগণের কল্যাণের জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিবৃতিতে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এছাড়া, ইরানে হামলার পর সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে একজন বাংলাদেশিসহ তিনজন নাগরিক নিহত হওয়ার খবরও নিশ্চিত করা হয়েছে, যেখানে আহতের সংখ্যা অন্তত ৫৮ জন বলে জানা গেছে।

রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া

ইস্যুটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। রোববার বিকালে ঢাকায় বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে শনিবার সন্ধ্যায় জরুরি বৈঠক করে এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে একটি প্রাথমিক বিবৃতি দিয়েছিল। তবে রোববারের বিবৃতিটি নিয়ে তৈরি হওয়া সমালোচনা ও বিতর্ক এখনও অব্যাহত রয়েছে, যা বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে ঘিরে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।