মোদি-নেতানিয়াহুর 'হেক্সাগন' জোট: পাকিস্তানের নিরাপত্তায় নতুন উদ্বেগের কারণ
মোদি-নেতানিয়াহুর 'হেক্সাগন' জোটে পাকিস্তানের নিরাপত্তা ঝুঁকি

মোদি-নেতানিয়াহুর 'হেক্সাগন' জোট: পাকিস্তানের নিরাপত্তায় নতুন উদ্বেগের কারণ

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইসরাইল সফর কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক সফর নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করছে। ২০১৭ সালের ঐতিহাসিক সফরের পর দ্বিতীয়বারের মতো মোদির এই ইসরাইল ভ্রমণ এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আন্তর্জাতিক মহলে অনেকটা কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছেন। কিন্তু এই কূটনৈতিক আলিঙ্গন ইসলামাবাদের নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও চওড়া করে তুলেছে।

হেক্সাগন জোটের ধারণা ও পাকিস্তানের অবস্থান

ভারত ও ইসরাইলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান এই কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা পাকিস্তানের জন্য একই সাথে নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। সম্প্রতি নেতানিয়াহু একটি 'হেক্সাগন' বা ছয় কোণ বিশিষ্ট জোটের ধারণা সামনে এনেছেন, যার কেন্দ্রে রাখা হয়েছে ভারতকে। এই জোটের ঘোষিত লক্ষ্য হলো তথাকথিত 'উগ্র শিয়া অক্ষ' এবং 'উদীয়মান উগ্র সুন্নি অক্ষ' মোকাবিলা করা। যদিও নেতানিয়াহু সুন্নি অক্ষের দেশগুলোর নাম স্পষ্ট করেননি, তবে তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো যারা ইসরাইলের গাজা নীতির তীব্র সমালোচক এবং সম্প্রতি সৌদি আরবের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে, তারা যে এই সংজ্ঞার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।

প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি অংশীদারিত্বের গভীর উদ্বেগ

পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ভারত-ইসরাইলের গভীর অংশীদারিত্ব। ভারত বর্তমানে ইসরাইলের বৃহত্তম অস্ত্র ক্রেতা হিসেবে পরিচিত। এবারের সফরে 'আয়রন বিম' (উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন লেজার অস্ত্র) এবং 'আয়রন ডোম' প্রযুক্তি হস্তান্তরের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো আলোচনার টেবিলে রয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান আকাশযুদ্ধের সময় ভারতীয় বাহিনীর ইসরাইলি ড্রোন ব্যবহারের স্মৃতি এখনো ফিকে হয়ে যায়নি। ফলে ইসরাইলের অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সাইবার প্রযুক্তি ভারতের হাতে আসা মানেই পাকিস্তানের জন্য সামরিক ভারসাম্য বজায় রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়া।

কূটনৈতিক বয়ান ও আঞ্চলিক ভারসাম্য

কূটনীতিকদের মতে, ভারত ও ইসরাইল উভয় দেশই তাদের নিরাপত্তা ডকট্রিন সাজিয়েছে 'ইসলামি উগ্রবাদ' মোকাবিলার বয়ানে। মোদি এই সফরে নেতানিয়াহুর কাছে পাকিস্তানকে একটি অস্থিতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে চিত্রিত করার সুযোগ নিতে পারেন। যদিও পাকিস্তান গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং সৌদি আরবের সাথে কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে নিজের চারপাশে একটি সুরক্ষাবলয় তৈরির চেষ্টা করেছে, কিন্তু ভারত-ইসরাইল-সংযুক্ত আরব আমিরাত যে ত্রিভুজ অর্থনৈতিক ও সামরিক বলয় গড়ে তুলছে, তা পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের পারমাণবিক শ্রেষ্ঠত্বের দাপটকেও মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে পাকিস্তানের প্রভাব বজায় রাখাও এখন একটি কঠিন ভারসাম্য রক্ষার লড়াই। একদিকে সৌদি আরব ও তুরস্কের সাথে প্রতিরক্ষা সংহতি, অন্যদিকে ভারতের সাথে আমিরাতের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সখ্য—এই দুইয়ের মাঝে পাকিস্তানকে তার অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।

সম্ভাব্য পরিণতি ও পাকিস্তানের কৌশল

পরিশেষে, মোদির এই সফর কেবল ভারতের অস্ত্রভাণ্ডার সমৃদ্ধ করবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলবিরোধী ব্লক হিসেবে পরিচিত দেশগুলোর বিরুদ্ধে ভারতকে একটি 'প্রক্সি' শক্তি হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করতে পারে। পাকিস্তানের জন্য এখন একমাত্র পথ হলো ভূ-অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়ানো এবং মধ্য এশিয়া, তুরস্ক ও ইরানের সাথে আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা। ভারত-ইসরাইল মৈত্রীর এই নতুন সমীকরণ মোকাবিলায় ইসলামাবাদের প্রয়োজন হবে নিপুণ কূটনৈতিক দক্ষতা ও সামরিক সতর্কতার এক সমন্বিত কৌশল। এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের নিরাপত্তা নীতিতে ব্যাপক পুনর্বিবেচনার দাবি উঠছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।