ভারত-ইসরায়েল সম্পর্ক: কাশ্মীরে 'ইসরায়েলি মডেল' বাস্তবায়নের গভীর কূটনৈতিক ইঙ্গিত
ভারত-ইসরায়েল সম্পর্ক: কাশ্মীরে 'ইসরায়েলি মডেল' বাস্তবায়ন

ভারত-ইসরায়েল সম্পর্ক: কাশ্মীরে 'ইসরায়েলি মডেল' বাস্তবায়নের গভীর কূটনৈতিক ইঙ্গিত

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে নিযুক্ত ভারতের প্রাক্তন কনসাল জেনারেল সন্দীপ চক্রবর্তী ২০১৯ সালের নভেম্বরে একটি ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে ক্যামেরায় ধরা পড়েন। সেখানে তিনি ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে নয়াদিল্লিকে ‘ইসরায়েলি মডেল’ গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এই বক্তব্যের কয়েক মাস আগেই, ২০১৯ সালের আগস্টে, হিন্দুত্ববাদী বিজেপি দলীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার কাশ্মীর অঞ্চলের আধা স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা বাতিল করেছিল।

কাশ্মীরে সামরিক অবরোধ ও নিপীড়নের পটভূমি

সন্দীপ চক্রবর্তীর বক্তব্যের সময় কাশ্মীরের লাখ লাখ মানুষ এক ভয়াবহ সামরিক অবরোধ এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন। মোদি সরকার হাজার হাজার মানুষকে কারাগারে ভরেছিল, যাদের মধ্যে ওই অঞ্চলের রাজনৈতিক নেতারাও ছিলেন। এমনকি ভারতপন্থী হিসেবে পরিচিত কাশ্মীরি নেতাদেরও তখন আটক করা হয়েছিল। সন্দীপ ওই অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘এটি মধ্যপ্রাচ্যে ঘটেছে। ইসরায়েলিরা যদি এটি করতে পারে, আমরাও পারি’। তিনি যোগ করেন, মোদি সরকার এটি করতে ‘দৃঢ়প্রতিজ্ঞ’।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে আদর্শিক মিল

ছয় বছর পর সন্দীপ চক্রবর্তীর কথাগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সত্য মনে হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, মোদির সরকার ক্ষমতায় আসার পর ফিলিস্তিনিদের প্রতি দীর্ঘদিনের সমর্থন বিসর্জন দিয়ে খোলাখুলিভাবে ইসরায়েলকে গ্রহণ করেছে। নয়াদিল্লি ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের নিরাপত্তা, নিপীড়ন এবং প্রশাসনিক পদ্ধতির একাধিক উপাদান আমদানি করেছে। ২০২৩ সালে প্রকাশিত ‘হোস্টাইল হোমল্যান্ডস: দ্য নিউ অ্যালায়েন্স বিটুইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড ইসরায়েল’ বইয়ের লেখক আজাদ এসা বলেন, ‘মোদির অধীনে ভারত-ইসরায়েল সম্পর্ক হলো এমন দুটি আদর্শের বন্ধন, যারা নিজেদের সভ্যতাগত প্রকল্প হিসেবে দেখে এবং মুসলিমদের জনসংখ্যাগত ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে।’

‘বুলডোজার জাস্টিস’ এবং ইসরায়েলি প্রভাব

ইসরায়েল থেকে ভারতের শিক্ষা নেওয়ার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হলো নরেন্দ্র মোদির দলের তথাকথিত ‘বুলডোজার জাস্টিস’ বা বুলডোজারের মাধ্যমে বিচার। গত এক দশকে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি শাসিত বেশ কয়েকটি রাজ্যের সরকার শত শত মুসলিমের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট গুঁড়িয়ে দিয়েছে। শুধু তা–ই নয়, অসংখ্য মসজিদ গুঁড়িয়ে দিয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কোনো আইনি নোটিশ ছাড়াই এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। ভারতের বৃহত্তম রাজ্য উত্তর প্রদেশের উগ্র হিন্দুত্ববাদী মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এখন তাঁর সমর্থকদের কাছে ‘বুলডোজার বাবা’ নামে পরিচিত।

নিরাপত্তা তত্ত্ব এবং সামরিক সহযোগিতা

ভারত-ইসরায়েল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সামনের সারিতে রয়েছে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এবং একই ধরনের নিরাপত্তা তত্ত্ব। ভারত ইসরায়েলি অস্ত্রের বৃহত্তম ক্রেতা, যা কিনতে তারা শত শত কোটি ডলার ব্যয় করছে। গাজায় নির্বিচার হামলা ও হত্যাযজ্ঞের মধ্যেও ভারত ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ করছে। ইসরায়েল ভারতীয় সেনাদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ড্রোন, বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং উন্নত রাডার ও নজরদারি প্রযুক্তি সরবরাহ করছে।

কাশ্মীরে ইসরায়েলি কৌশলের প্রতিফলন

বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, কাশ্মীরের সঙ্গে ফিলিস্তিনের অতীত ও বর্তমান আলাদা হলেও বর্তমানে কাশ্মীরে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের আচরণের সঙ্গে অনেক বেশি মিলে যায়। আজাদ এসা বলেন, ‘দুই দেশের ওইসব অঞ্চলে সামরিকীকরণ, জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা এবং আইনি কাঠামো রয়েছে। আর এটি উভয় দেশকে তাদের দখলদারত্ব পরিচালনা করতে এবং চেকপয়েন্ট থেকে শুরু করে তল্লাশি ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে মানুষের ওপর প্রতিদিনের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সাহায্য করছে।’

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের মুসলিমরা বিভিন্ন সামাজিক বর্জনের মুখোমুখি হয়েছে। তাদের জন্য বাড়িভাড়া পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে, মুসলিম শিশুরা স্কুলে হয়রানির শিকার হচ্ছে এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হামলার ভয়ে অনেক গ্রাম থেকে পুরো সম্প্রদায় পালিয়ে গেছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত রায় দিয়েছেন, সরকার কোনো অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির সম্পত্তিও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে ধ্বংস করতে পারবে না। তবে, বাস্তবে সরকার আদালতের রায়ে তোয়াক্কা করছে না। বরং এই ধরনের উচ্ছেদ অব্যাহত রয়েছে।