তুরস্কে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২৬ পালিত
তুরস্কে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন

তুরস্কে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২৬ পালিত

তুরস্কে বাংলাদেশ দূতাবাসের আয়োজনে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২৬ যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে। ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের প্রথম প্রহরে তুরস্কে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. আমানুল হকের নেতৃত্বে দূতাবাসের কর্মকর্তা, কর্মচারী ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের উপস্থিতিতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করার মাধ্যমে দিবসটির আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।

প্রথম পর্ব: সকালের অনুষ্ঠান

সকালে দূতাবাস মিলনায়তনে ভাষাশহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর শহীদদের আত্মার মাগফিরাত, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত এবং দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কর্তৃক প্রেরিত বাণী পাঠ করা হয়, যা দিবসের তাৎপর্যকে আরও গভীরভাবে তুলে ধরে।

দ্বিতীয় পর্ব: পুষ্পস্তবক অর্পণ ও প্যানেল আলোচনা

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে সন্ধ্যায় রাষ্ট্রদূত মো. আমানুল হকের নেতৃত্বে দূতাবাসের কর্মকর্তা, কর্মচারী ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণে দূতাবাস প্রাঙ্গণে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। এরপর দূতাবাসের ‘বিজয় ৭১ মিলনায়তনে’ রাষ্ট্রদূতের সভাপতিত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনার বিষয় ছিল ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস এবং ভিনদেশে পরবর্তী প্রজন্মকে মাতৃভাষা শেখানোর গুরুত্ব, প্রতিকূলতা ও উত্তরণের উপায়’

স্বাগত বক্তব্যে দূতাবাসের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ইফতেকুর রহমান ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব তুলে ধরেন। আলোচনা সভায় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বব্যাংকের ইউরোপ ও মধ্য এশিয়া অঞ্চলের সিনিয়র সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্পেশালিস্ট ফেরদৌস জাহান, আংকারার টেড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম এবং ইস্তাম্বুলের ইলদিজ টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক এ এফ এম শাহেন শাহ্।

বক্তারা ভাষা আন্দোলনের পটভূমি তুলে ধরে বলেন, ‘যদিও ভারতবর্ষ ভাগ হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে, তবুও আমাদের ভাষা ছিল আমাদের পরিচয়। বাংলা ভাষা ও ধর্মের সংমিশ্রণে আমাদের জাতিগত পরিচয় গড়ে উঠেছে এবং তার ফলেই আজকের এই বাংলাদেশের অস্তিত্ব রয়েছে।’

তৃতীয় পর্ব: শিশুদের অংশগ্রহণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

অনুষ্ঠানের তৃতীয় পর্বে আমন্ত্রিত প্রবাসী বাংলাদেশিদের সন্তানদের মঞ্চে ডেকে নেওয়া হয় এবং তাদের বাংলা ভাষার বর্ণ ও শব্দ লিখতে দেওয়া হয়। ভিনদেশে বড় হয়েও তারা বাংলা বর্ণ ও শব্দ লিখতে সক্ষম হয়, যা দর্শকদের মুগ্ধ করে। বাংলা ভাষায় তাদের নিজস্ব অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে পারায়, রাষ্ট্রদূত এবং অন্যান্য অতিথিরা ভিনদেশে বেড়ে ওঠা এই নতুন প্রজন্মের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন।

এরপর এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে বাংলাদেশ সম্প্রদায়ের সদস্য সৌভিক দাস ও সৃষ্টি দত্ত গান পরিবেশন করেন এবং মার্জিয়া কবীর ও মোছা সুলতানা শামীমা কবিতা আবৃতি পরিবেশন করেন। সবশেষে সবাই সমবেত কণ্ঠে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি..’ গানটি পরিবেশন করেন, যা অনুষ্ঠানটিকে আবেগময় করে তোলে। আগত অতিথিদের আপ্যায়নের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।

এই অনুষ্ঠানটি তুরস্কে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা এবং দেশের প্রতি অঙ্গীকারকে আরও শক্তিশালী করেছে। এটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।