নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের প্রথম সাক্ষাৎকার: 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' নীতির ঘোষণা
আজ বুধবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক কথোপকথনে অংশ নেন নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা তুলে ধরেন এবং 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' নীতিকে কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেন।
'বাংলাদেশ ফার্স্ট' নীতির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন, 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' নীতিই হবে আমাদের পররাষ্ট্র কর্মকাণ্ডের মূল ভিত্তি। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী, দেশের স্বার্থ সম্পূর্ণভাবে রক্ষা করে সকল কূটনৈতিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে। তিনি বলেন, 'আমাদের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য হবে সার্বভৌমত্ব রক্ষা, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, জাতীয় মর্যাদা বজায় রাখা এবং পারস্পরিক সুবিধা নিশ্চিত করা।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'জাতীয় স্বার্থ আমাদের রেডলাইন বা চূড়ান্ত সীমানা হিসেবে বিবেচিত হবে। আমরা প্রতিটি পদক্ষেপে পই পই করে এই স্বার্থ বুঝে নেব।' এই ঘোষণার মাধ্যমে নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির দৃঢ় অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে অগ্রাধিকার
রোহিঙ্গা সংকট সম্পর্কে জানতে চাইলে খলিলুর রহমান বলেন, 'মিয়ানমারের ওপর আমাদের নজরদারি কোনোভাবেই কমবে না, বরং আরও বৃদ্ধি পাবে।' তিনি উল্লেখ করেন যে মিয়ানমার সরকার এবং আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখা হবে এবং সমস্যা সমাধানের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হবে।
তিনি বলেন, 'রোহিঙ্গা ইস্যুটি আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও মানবিক দায়িত্বের সঙ্গে জড়িত। আমরা এ বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করব এবং টেকসই সমাধানের দিকে অগ্রসর হব।'
জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা
পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতিতে ফিরে যাবে বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, 'অন্তর্বর্তী সরকারে আমরা এই নীতির প্রয়োগ চেষ্টা করেছি এবং বর্তমান সরকারেও তা অব্যাহত থাকবে।'
তিনি জিয়াউর রহমানের শাসনামলের তিনটি সাহসী পদক্ষেপের কথা স্মরণ করেন:
- জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের সদস্য নির্বাচিত হওয়া
- সার্কের প্রতিষ্ঠা
- বিশ্বশান্তি রক্ষায় আল কুদস কমিটিতে বাংলাদেশের ভূমিকা
এই উদ্যোগগুলোকে তিনি বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্যের মাইলফলক হিসেবে বর্ণনা করেন।
নির্বাচন ও সরকারে যোগদান নিয়ে প্রশ্নের জবাব
সাংবাদিকদের তরফ থেকে নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং তাঁর মন্ত্রিসভায় যোগদান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে খলিলুর রহমান বলেন, 'অনেকে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কথা বলছেন, কিন্তু গণনা পুনরায় যাচাই করা যেতে পারে।' তিনি হালকা মেজাজে যোগ করেন, 'গুনতে তো মুশকিল নাই।'
বিএনপির পূর্ববর্তী উদ্বেগ এবং তাঁর মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তি সম্পর্কে তিনি বলেন, 'আমি জোর করে যাইনি। মানুষের ধারণা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন হতে পারে।' এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার গতিশীলতা তুলে ধরেন।
গণমাধ্যমের ভূমিকা ও দায়িত্বশীলতা
নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী গণমাধ্যমের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, 'আমরা আপনাদেরকে বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করি এবং যোগাযোগ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।' তিনি উল্লেখ করেন যে গণমাধ্যম বাংলাদেশের মানুষের কাছে সরকারের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার মূল বাহক।
তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, 'পররাষ্ট্রনীতি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। একটি ভুল বার্তা বা অপপ্রচার আমাদের সম্পর্ক নষ্ট করতে পারে। তাই আপনাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন।' তিনি সরকারের জবাবদিহিতার বিষয়টিও স্বীকার করেন।
এই সাক্ষাৎকারে খলিলুর রহমান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন, যেখানে জাতীয় স্বার্থ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে এবং বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।
