গত মাসে হোয়াইট হাউস করেসপনডেন্টস ডিনারে এক বন্দুকধারী বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পর এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
মার্কিনদের মধ্যে বিভাজন
প্রতি চারজন মার্কিন নাগরিকের একজন মনে করেন, হোয়াইট হাউস করেসপনডেন্টস ডিনারে গত এপ্রিলের গুলিবর্ষণের ঘটনাটি সাজানো ছিল। আজ সোমবার প্রকাশিত এক জরিপ বলছে, এ নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক বিভাজন দেখা গেছে। অনলাইন সংবাদমাধ্যমের নির্ভরযোগ্যতা যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান নিউজগার্ডের জরিপ অনুযায়ী, প্রতি তিন ডেমোক্র্যাট সমর্থকের একজন মনে করেন, ঘটনাটি সাজানো। রিপাবলিকানদের ক্ষেত্রে এই হার প্রতি আটজনে একজন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বয়স্ক ব্যক্তিদের চেয়ে ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে এ ঘটনাকে সাজানো মনে করার প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।
অভিযোগ ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব
গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন ডিসির একটি ফেডারেল গ্র্যান্ড জুরি অভিযুক্ত বন্দুকধারী কোল টমাস অ্যালেনকে অভিযুক্ত করেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যাচেষ্টাসহ তাঁর বিরুদ্ধে চারটি গুরুতর অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। ওয়াশিংটন হিলটন হোটেলে সেই ঘটনার পরপরই অনলাইনে নানা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ে। এসব তত্ত্বে দাবি করা হয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টির পক্ষে জনসমর্থন বৃদ্ধি করতে ট্রাম্প প্রশাসন নিজেই এ ঘটনার নাটক সাজিয়েছে।
জরিপের ফলাফল
নিউজগার্ডের জরিপে দেখা গেছে, ২৪ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, ঘটনাটি ভুয়া ছিল। তবে ৪৫ শতাংশ নাগরিক এটিকে সত্য বলে বিশ্বাস করেন। বাকি ৩২ শতাংশ নাগরিক এ বিষয়ে নিশ্চিত নন। এক হাজার মার্কিন নাগরিকের ওপর গত ২৮ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত এই জরিপ চালায় ‘ইউগভ’।
বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য
নিউজগার্ডের সম্পাদক সোফিয়া রুবিনসন এ নিয়ে বলেছেন, ‘এটি খুবই বিস্ময়কর।’ তিনি আরও বলেন, এই ফলাফল সরকার ও সংবাদমাধ্যমের প্রতি মার্কিন নাগরিকদের গভীর অবিশ্বাসের বিষয়টিই স্পষ্ট করেছে। সোফিয়া বলেন, ‘রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে সব পক্ষের মানুষই এখন বর্তমান প্রশাসন ও গণমাধ্যমের ওপর আস্থা হারাচ্ছেন।’ তবে মানুষ যাচাই–বাছাই ছাড়া অনলাইনে পাওয়া তথ্যের ওপর সহজেই বিশ্বাস রাখছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
হোয়াইট হাউসের প্রতিক্রিয়া
হোয়াইট হাউস অবশ্য এসব ‘ষড়যন্ত্রতত্ত্ব’ প্রত্যাখ্যান করেছে। গত এপ্রিলে এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ডেভিস ইঙ্গল দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, ‘যাঁরা মনে করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজের ওপর হামলার নাটক সাজিয়েছেন, তাঁরা আসলে বোকা।’
গবেষকদের বিশ্লেষণ
সংবাদমাধ্যমের কারসাজি নিয়ে গবেষণা করেন বোস্টন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জোয়ান ডনোভান। তিনি বলেন, এমন ফলাফল ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিতে ‘শোম্যানশিপ’ আচরণেরই প্রতিফলন। ডনোভান বলেন, ‘এ হামলার ঘটনা সাজানো—এমন ভাবাটা অবিশ্বাস্যভাবে হলিউড সিনেমার মতো মনে হয়।’ তিনি আরও বলেন, পুরো সরকারি ব্যবস্থাকে একটি রিয়েলিটি টিভি শোতে রূপান্তর করা হয়েছে।
অন্যান্য হত্যাচেষ্টা প্রসঙ্গ
২০২৪ সালে ট্রাম্পকে আরও দুবার হত্যার চেষ্টা করা হয়। প্রথমটি ছিল পেনসিলভানিয়ার বাটলারের এক জনসভায় এবং দ্বিতীয়টি ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল গলফ ক্লাবে। এরপরই এপ্রিলে এ ঘটনা ঘটে। ট্রাম্পের জনসভায় ঘটে যাওয়া তিনটি বন্দুক হামলার কোনোটিই সাজানো ছিল বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও অনেক মার্কিন নাগরিক এখনো বিশ্বাস করেন, প্রতিটি ঘটনাই সাজানো ছিল।
বাটলার ও গলফ ক্লাবের ঘটনা
পেনসিলভানিয়ার বাটলারের হত্যাচেষ্টার বিষয়ে ২৪ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, এটি সাজানো ছিল। ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের ৪২ শতাংশ এই ঘটনাকে ‘সাজানো নাটক’ মনে করেন। বিপরীতে মাত্র ৭ শতাংশ রিপাবলিকান সমর্থক এমনটি ভাবেন। এদিকে গলফ ক্লাবে হত্যাচেষ্টার ঘটনাটি সাজানো ছিল বলে মনে করেন ১৬ শতাংশ মার্কিন। এর মধ্যে ২৬ শতাংশ ডেমোক্র্যাট এবং ৭ শতাংশ রিপাবলিকান রয়েছেন।
সামগ্রিক চিত্র
সব মিলিয়ে দেখা গেছে, ২১ শতাংশ ডেমোক্র্যাট সমর্থক বিশ্বাস করেন, তিনটি ঘটনাই সাজানো ছিল। বিপরীতে স্বতন্ত্র ভোটারদের ১১ শতাংশ এবং রিপাবলিকানদের মাত্র ৩ শতাংশ এমনটি মনে করেন। ডনোভান বলেন, ডেমোক্র্যাটদের এই অবিশ্বাসে তিনি অবাক নন। তিনি বলেন, ‘বামপন্থীদের মধ্যে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব নিয়ে ভাবনার প্রবণতা বাড়ছে। এর প্রধান কারণ হলো, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থার সংকট।’
উগ্রবাদ পর্যবেক্ষকদের মত
অনলাইন উগ্রবাদ পর্যবেক্ষণকারী গ্রুপ ‘ওপেন মেজারস’-এর জ্যেষ্ঠ গবেষক জ্যারেড হোল্ট বলেন, এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব কতটা ছড়িয়ে পড়ছে। হোল্ট বলেন, জরিপের এই ফল আমাকে খুব একটা অবাক করেনি। তবে পরিস্থিতি অবশ্যই হতাশাজনক। ষড়যন্ত্রতত্ত্ব এখন রাজনীতিতে এমনভাবে মিশে গেছে যে মানুষের বড় একটি অংশের কাছে এটি এখন তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে।
উপসংহার
ডনোভান বলেন, জটিল কোনো ঘটনার কারণ খুঁজতে গিয়ে মানুষ খুব স্বাভাবিকভাবেই ষড়যন্ত্রতত্ত্বের জালে জড়িয়ে পড়ে। ডনোভান আরও বলেন, দুর্ভাগ্যবশত যখন সরকার বা প্রতিষ্ঠানগুলো সত্য গোপন করে বা নিয়ম নিয়ে লুকোচুরি করে, তখন মানুষ ব্যবস্থার পচনের চেয়ে নিজের বিরুদ্ধে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র হয়েছে বলেই বেশি বিশ্বাস করতে চায়।



