প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে শপথ নেওয়ার দিন বিকেলে হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের বাসভবনে দাঁড়িয়ে রাজ্যের বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি যা বললেন, তা মহাকাব্যিক আয়রনি বা শেক্সপিয়ারের ট্র্যাজেডির সঙ্গেও তুলনা করা যেতে পারে। বিবিসি বাংলার খবরে বলা হয়েছে, তিনি সেদিন সোজাসুজি দেশের বাম, অতিবাম ও জাতীয় শক্তিগুলোকে তার সঙ্গে হাত মেলানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বিজেপির বিরুদ্ধে এখন সবাইকে একজোট হতে হবে এবং শত্রুর শত্রুকেই বন্ধু বলে ভাবতে প্রস্তুত তিনি। এমনকি আলোচনার দরজা খুলে রেখে বাড়িতে কখন থেকে কখন তাকে পাওয়া যাবে, সেটাও তিনি জানিয়ে দেন।
বামফ্রন্টের পতন ও মমতার উত্থান
২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের চৌত্রিশ বছরের একটানা শাসনের অবসান ঘটিয়ে মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রথম সরকার ক্ষমতায় আসে। এটি রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় মাইলফলক। সিপিআইএম-এর নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে শাসক দলের একচ্ছত্র প্রভাব সমাজ, রাজনীতি, প্রশাসন ও দৈনন্দিন জীবনের সর্বত্র এমনভাবে প্রবেশ করেছিল যে, মাত্র ১০-১২ বছরের পুরনো একটি রাজনৈতিক দল প্রায় একজন ব্যক্তির ভরসায় বামপন্থিদের ক্ষমতা থেকে প্রায় নির্মূল করে দিতে পারবে, তা অনেকে ভাবতেই পারেননি। মমতা ব্যানার্জি প্রায় একার হাতে সেই অসাধ্য সাধন করেছিলেন এবং বামপন্থিদের ক্ষমতা থেকে পশ্চিমবঙ্গকে হঠানো তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
বৃত্ত সম্পূর্ণ করা
কিন্তু সেই ঘটনার ১৫ বছরের মাথায় তিনি এখন সেই 'লেফট' বা 'আলট্রা লেফট'-দেরও তার সঙ্গে হাত মেলানোর জন্য আহ্বান জানাচ্ছেন। এটি থেকে বোঝা যায় তার রাজনৈতিক জীবনও একটি বৃত্ত সম্পূর্ণ করেছে। বামপন্থি দলগুলো তার প্রস্তাব পত্রপাঠ খারিজ করলেও, মমতা ব্যানার্জি নির্বাচনি বিপর্যয়ের ধাক্কা কাটিয়ে উঠে নিজের মতো করে আবার ঘর গোছানোর চেষ্টা শুরু করেছেন এবং রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়াতে চাইছেন।
প্রাথমিক জীবন ও রাজনৈতিক যাত্রা
কলকাতার যোগমায়া দেবী কলেজের ছাত্রী সংগঠন থেকে কংগ্রেসি রাজনীতিতে হাতেখড়ি মমতা ব্যানার্জির। তার রাজনৈতিক জীবন ৫০ বছরেরও বেশি পুরনো এবং সংসদীয় রাজনীতিতে তিনি ৪২ বছর ধরে আছেন। ১৯৭৬ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য নারী কংগ্রেসের (আই) সাধারণ সম্পাদক হন এবং কয়েক বছর পর নিখিল ভারত যুব কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক হন।
কলকাতার রাজনৈতিক বিশ্লেষক শিখা মুখার্জি বিবিসিকে বলেন, মমতার বিশেষত্ব হলো তার প্রচণ্ড লড়াকু মনোবৃত্তি এবং পরিশ্রম করার ক্ষমতা। তার রাজনৈতিক জীবনে বহু বাধা এসেছে, ২০০১ সালে রাজ্য নির্বাচনে হারার পর তার দল তৃণমূল কংগ্রেস প্রায় ধ্বংস হবার উপক্রম হয়েছিল, কিন্তু তিনি আবার উঠে দাঁড়িয়েছেন এবং দলকে পুনর্গঠিত করেছেন।
১৯৮৪ সালের সাড়া জাগানো জয়
প্রতীচী ট্রাস্টের সাবির আহমেদ বিবিসিকে বলেন, সবচেয়ে বড় ঘটনা হলো ১৯৮৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে সোমনাথ চ্যাটার্জির মতো প্রবীণ সিপিআই(এম) নেতাকে হারানো। যাদবপুর লোকসভা আসনে সেই প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতাকে হারিয়ে মমতা ব্যানার্জি ভারতের কনিষ্ঠতম পার্লামেন্ট সদস্যদের একজন হন। যদিও ১৯৮৪ সালের নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর কংগ্রেস বিপুল সহানুভূতি ভোট পেয়েছিল, তবু যাদবপুরের মতো বামপন্থিদের শক্ত ঘাঁটিতে সোমনাথ চ্যাটার্জির মতো ডাকসাইটে নেতা একজন আনকোরা তরুণী নেত্রীর কাছে হেরে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে হইচই ফেলে দিয়েছিল।
লোকসভায় প্রতিবাদী ভূমিকা
লোকসভা সদস্য থাকাকালীন মমতা ব্যানার্জির 'লড়াকু' ও 'প্রতিবাদী' ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে। নিজ দলের বিরুদ্ধে সিপিআইএমকে সহায়তার অভিযোগ আনা, পার্লামেন্ট ভবনে পেট্রোলিয়াম মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ, একজন এমপির সঙ্গে হাতাহাতি, পশ্চিমবঙ্গের প্রতি বঞ্চনার প্রতিবাদে রেলমন্ত্রীর প্রতি শাল ছুঁড়ে মারা এবং এমপি পদ থেকে ইস্তফা—এসব ঘটনায় তিনি আলোচিত হন।
১৯৯১ সালে তিনি প্রথম কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী হন, যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন পি ভি নরসিমহা রাও। ১৯৯৯ সালে বিজেপি-নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের অংশ হিসেবে তিনি প্রথম পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে রেল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।
তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতায় আসা
মমতা ব্যানার্জি ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এটি বামফ্রন্ট-শাসিত পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। ২০০৫ সাল থেকে কৃষিজমি বরাদ্দের ঘটনাকে কেন্দ্র করে গণঅসন্তোষ তৈরি হয়, বিশেষ করে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে জমি রক্ষার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যের প্রধান বিরোধীদলে পরিণত হয়। নন্দীগ্রামে আন্দোলনরত জনতার ওপর পুলিশের গুলিতে অন্তত ১৪ জন নিহত হওয়ার পর বামফ্রন্ট সরকার-বিরোধী মনোভাব জোরদার হয়। নন্দীগ্রামে কৃষকদের বিক্ষোভে নেতৃত্ব দিয়ে মমতা ব্যানার্জি রাজ্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা হয়ে ওঠেন।
২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল বামফ্রন্টের চেয়ে বেশি আসন পায় এবং ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের সাথে জোট বেঁধে ৩৪ বছর ধরে ক্ষমতাসীন বামফ্রন্টকে হারায়। মমতা ব্যানার্জি হন পশ্চিমবঙ্গের প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী এবং এরপর ২০১৬ ও ২০২১ সালের নির্বাচনেও বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হন।
মুখ্যমন্ত্রিত্বের চ্যালেঞ্জ
মুখ্যমন্ত্রিত্বের পনেরো বছরে দুর্নীতির অভিযোগ তাকে ও তার দলকে বিপর্যস্ত করেছে। সাদামাটা জীবনযাপন আর নীল-সাদা হাওয়াই চটি যার সততার ট্রেডমার্ক ছিল, তার নিজের গলাতেও শোনা গেছে অভিমান ও উৎকণ্ঠা। তিনি নির্বাচনী জনসভায় বলেছেন, 'ভুল করলে আমায় চড় মারবেন, কিছু মনে করব না। বললে বাড়িতে গিয়ে বাসনও মেজে দিয়ে আসব। কিন্তু দয়া করে চোর বলবেন না, মিথ্যে বদনাম দেবেন না!'
বিরোধী বিজেপি ও সিপিআইএম অভিযোগ করেছে, তিনি শিল্প টানতে ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যর্থ। তারা বলে, এই দেড় দশকে রাজ্যে বড় লগ্নি একটাও আসেনি—মুখ্যমন্ত্রী শুধু ধূপকাঠি বা তেলেভাজা শিল্পকে উৎসাহ দিয়ে গেছেন। প্রয়াত বামপন্থী নেতা শ্যামল চক্রবর্তী মনে করতেন, রাজপথে সফল আন্দোলনের ঐতিহ্য মমতাকে বিরোধী নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিলেও ক্ষমতায় আসার পর সেটাই তাকে প্রশাসক হিসেবে ডুবিয়েছে।
জনপ্রিয়তার উৎস
পশ্চিমবঙ্গের একটি বড় অংশের মানুষের ধারণা ছিল, তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাকর্মীরা যতই দুর্নীতিতে লিপ্ত থাকুক, দলের সর্বোচ্চ নেত্রীকে সেই কলঙ্ক কখনো স্পর্শ করেনি। ব্যক্তিগতভাবে তিনি সব দুর্নীতির ঊর্ধ্বে—এমনটাই মনে করতেন অনেকে। কবি সুবোধ সরকার বলতেন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার অসাধারণ 'কানেক্ট'ই তাকে বিপুল জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে। সমাজের দরিদ্রতম অংশের সঙ্গে তিনি যেভাবে মিশতে পারেন, তাদের উঠোনে বসে তাদের ভাষায় কথা বলতে পারেন, সেটাই তাকে মানুষের আপন করে তুলেছে। তিনি বিবিসিকে বলেন, চৌত্রিশ বছরে কমিউনিস্টদের সঙ্গে মানুষের বিরাট দূরত্ব তৈরি হয়ে গিয়েছিল। গরিবের সঙ্গে গরিবের স্তরে নেমে এসে মেশা শহুরে চোখে অদ্ভুত লাগতে পারে, কিন্তু আমার মতে এটাই মমতা ব্যানার্জির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।
সমালোচনা ও ভবিষ্যৎ
একদা কংগ্রেস নেতা ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ওমপ্রকাশ মিশ্র মনে করতেন, সংসদীয় রাজনীতির গরিমা তিনি রাখতে পারেননি। তিনি বিবিসিকে বলেছিলেন, 'মমতা সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করতে চান। এমনকি তিনি বলছেন, সব কেন্দ্রে উনিই প্রার্থী—বাকিরা কেউ কিছু নন। ফলে সংসদীয় গণতন্ত্রকেও তাঁর দল সম্মান জানাচ্ছে না।' পরে মিশ্র নিজেই তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রমাণ করেছে, মমতার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা দলের সব ব্যর্থতা ঢেকে জেতানোর জন্য আর যথেষ্ট নয়। প্রবীণ সাংবাদিক রন্তিদেব সেনগুপ্ত মনে করেন, মমতাকে এখনই অপ্রাসঙ্গিক মনে করা ভুল হবে। তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, 'মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ৮০ জন বিধায়ক, লোকসভা ও রাজ্যসভা মিলিয়ে ৪২ জন এমপি এবং এখনো ৪১ শতাংশ ভোট রয়ে গিয়েছে।'
তবে বিবিসির সাথে কথা বলা অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, মমতার পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো খুব কঠিন। এটি নির্ভর করবে তিনটি ফ্যাক্টরের ওপর: প্রথমত, তিনি দলকে অক্ষত রাখতে পারেন কিনা; দ্বিতীয়ত, অভিষেক ব্যানার্জি ফ্যাক্টর তিনি কীভাবে সামলান; এবং তৃতীয়ত, তিনি কি সফল বিরোধী নেত্রী হিসেবে নিজের পুরনো পরিচয় পুনরাবিষ্কার করতে পারবেন।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, এই রাজ্যের মানুষ একবার কোনো দলকে ক্ষমতা থেকে ছুঁড়ে ফেললে তাদের আর ক্ষমতায় ফেরার সুযোগ দেয় না। মমতা ব্যানার্জি সেই রীতির ব্যতিক্রম ঘটাতে পারবেন কিনা, তা নির্ভর করবে তার নিজের ওপরেই।



