বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ বলেছেন, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক তিক্ত ও স্থবির হয়ে পড়েছিল। সেই তিক্ততার পুনরাবৃত্তি ভারত দেখতে চায় না। মঙ্গলবার (৫ মে) নয়াদিল্লির সুষমা স্বরাজ ভবনে সফররত বাংলাদেশি সাংবাদিক প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এ কথা বলেন।
সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা
পঙ্কজ শরণ বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, সংসদীয় নির্বাচনের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানাতে দেরি করেননি। বিএনপিও ভারতের বার্তার প্রাপ্তি স্বীকার করেছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক গত ৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থায় রয়েছে, যা শেখ হাসিনার সময়ের চেয়ে ভিন্ন।
২০০১-২০০৬ সালের তিক্ততা
পঙ্কজ শরণ স্মরণ করিয়ে দেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দুই দেশের সম্পর্ক প্রায় ভেঙে পড়েছিল। ভারতের উদ্বেগ ছিল যে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে উত্তর-পূর্ব ভারতে সশস্ত্র কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। বাংলাদেশ সেই অভিযোগ অস্বীকার করায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। তখন কোনো কার্যকর আলোচনা হয়নি, যা নেতিবাচক ফলাফল এনেছিল।
তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে বলে ধারণা ছিল। অপরদিকে ভারত শুধু একটি রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করে বলে মনে করা হতো। নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির মিশ্রণ সম্পর্কের ওপর বড় প্রভাব ফেলেছিল।
নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি
পঙ্কজ শরণ বলেন, বাংলাদেশ এখন পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার চেষ্টা করছে এবং চীনের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বাংলাদেশের নতুন সরকার চীন, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে পরিচালনা করবে এবং সেই প্রেক্ষাপটে ভারতের অবস্থান কী হবে।
ভারত সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি হলো ২০০১-২০০৬ সালের সমস্যাগুলোর মূল্যায়ন ভুল ছিল না। তবে তারা নতুন করে ভাবতে এবং বর্তমান বাংলাদেশের নেতৃত্বের সঙ্গে নতুন অধ্যায় শুরু করতে প্রস্তুত। তিনি শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের উদাহরণ দেন, যেখানে ভারতবিরোধী এজেন্ডা নিয়ে জয়ী সরকারগুলোর সঙ্গে এখন ভারতের সম্পর্ক ভালো।
গোয়েন্দা তৎপরতা ও নতুন হাইকমিশনার
বাংলাদেশে ভারতীয় গোয়েন্দাদের বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতার অভিযোগকে পঙ্কজ শরণ অপপ্রচার ও অতিরঞ্জিত বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, পৃথিবীর সব দেশের গোয়েন্দা কার্যক্রম আছে এবং এই অপপ্রচার ভারতবিরোধী গোষ্ঠীর হতে পারে।
ভারতের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগের সিদ্ধান্তকে তিনি চমৎকার বলে উল্লেখ করেন। ত্রিবেদী অত্যন্ত সম্মানিত ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি, যিনি বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতি ভালো বোঝেন এবং কঠিন সমস্যার সমাধান দিতে পারবেন বলে আশাবাদী পঙ্কজ শরণ।
আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন
তিনি বলেন, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠনের ফলে কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার হবে, যা মাফিয়া ও অপরাধ দমনে সহায়ক হবে বলে তিনি আশাবাদী।
তিস্তা প্রকল্প ও গঙ্গার পানিবণ্টন
তিস্তা প্রকল্প প্রসঙ্গে পঙ্কজ শরণ বলেন, বাংলাদেশ চীনের সহায়তায় তিস্তা নদীতে ব্যারাজ নির্মাণ করতে চায়। এটি বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত, তবে ভারতের উদ্বেগ রয়েছে কারণ এটি অভিন্ন নদী।
গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। তিনি নেতিবাচক মন্তব্য শোনেননি। নতুন চুক্তির আলোচনায় পানি প্রবাহের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তি বছর পরিবর্তনের প্রস্তাব উঠতে পারে।
সীমান্ত হত্যা ও শেখ হাসিনা প্রসঙ্গ
সীমান্তে হত্যা কাম্য নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিটি ঘটনার আড়ালে অন্য গল্প থাকে। সমাধানে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সহযোগিতা ও প্রটোকল মেনে চলা প্রয়োজন। পুরনো সন্দেহের চর্চায় সমস্যার সমাধান হবে না।
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত কবে ফেরত পাঠাবে—এ প্রশ্নের জবাবে পঙ্কজ শরণ বলেন, এটি একটি আয়রনি। এখানে রাজনীতি ও আইনি বিষয় আছে। বিষয়টি সংবেদনশীল এবং দুই সরকার কীভাবে পরিচালনা করে তা দেখতে হবে। অতীতেও অনেক নেতা নিরাপত্তার জন্য বিদেশে বসবাস করেছেন, এটি প্রথম ঘটনা নয়।



