যুক্তরাষ্ট্রের জবাব পেল ইরান: ১৪ দফা প্রস্তাবে নতুন দিগন্ত
যুক্তরাষ্ট্রের জবাব পেল ইরান: ১৪ দফা প্রস্তাব

একসময় পৃথিবীর মানচিত্রে একটি শক্তি এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল যে, তার সিদ্ধান্তই যেন ছিল চূড়ান্ত বিধান। তার অর্থনীতি, সামরিক সক্ষমতা, প্রযুক্তি ও কূটনৈতিক বিস্তার—সবকিছু মিলিয়ে তাকে প্রায় অপরাজেয় বলে মনে হতো। বহু রাষ্ট্র, বহু জাতি, এমনকি বহু চিন্তাবিদও বিশ্বাস করতেন—এই পরাশক্তি অপরাজেয়; কিন্তু ইতিহাসের এক অমোঘ বৈশিষ্ট্য হলো—ইতিহাস কখনো স্থির থাকে না।

ইরানের ১৪ দফা প্রস্তাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের জবাব

সম্প্রতি যুদ্ধ অবসানে ইরানের দেওয়া ১৪ দফা প্রস্তাবের জবাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পাকিস্তানের মাধ্যমে এই জবাব তেহরানের হাতে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় সূত্র মতে, তেহরানের ১৪ দফা প্রস্তাবে সীমান্তসংলগ্ন অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহার, বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার এবং সর্বপ্রকার শত্রুতামূলক কার্যক্রম বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে; লেবাননে সামরিক অভিযানও এর অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি ৩০ দিনের মধ্যে চুক্তিতে উপনীত হওয়ার প্রস্তাব এবং যুদ্ধবিরতির পরিবর্তে সরাসরি যুদ্ধের অবসানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

পারমাণবিক আলোচনা স্থগিত

দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, বর্তমানে কোনো পারমাণবিক আলোচনা চলছে না এবং ইরান পুনরায় দাবি করেছে, তাদের কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পরাশক্তির মিথ এবং বর্তমান বিশ্ববাস্তবতা

বস্তুত, বর্তমান বিশ্ব আর একমুখী নয়—এটি বহুমাত্রিক। এখানে শক্তির কেন্দ্র একাধিক, প্রভাবের রেখা বহুস্তরীয়। এই বাস্তবতায় কোনো আঞ্চলিক সংঘাত আর কেবল আঞ্চলিক থাকে না—এটি পরিণত হয় বৃহত্তর শক্তিগুলোর অদৃশ্য প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে। সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এটাই পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাহ্যত পরাশক্তিধর রাষ্ট্রটি অপর রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সহজেই বিজয় অর্জন করতে পারত; কিন্তু অন্তরালে দাঁড়িয়ে আছে আরো বৃহত্তর কিছু শক্তির অন্তঃসলিলা ফল্গুধারার মতো সমর্থন। এই সমর্থন সরাসরি সৈন্য প্রেরণ নয়। বরং অর্থনৈতিক, কৌশলগত ও কূটনৈতিক ছায়া বিস্তার। ফলে, যাকে একা পরাস্ত করা সহজ বলে কেউ কেউ ধারণা করতেন বটে, বাস্তবে তা আর সহজ নয়।

পরাশক্তি কি মিথ?

আর এইখানেই সেই ‘পরাশক্তি’র বিষয়টি প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে। এখন পরাশক্তির বিষয়টি যেন অনেকের কাছে এইভাবে প্রতিভাত হচ্ছে যে, এটি যেন একটি মিথ। কিংবা এইভাবে বলা যায় যে, একটি সময় ছিল যখন বিশ্বে এখনকার মতো সমান্তরাল পরাশক্তিতুল্য শক্তিশালী রাষ্ট্র ছিল না। অর্থাৎ, পরাশক্তির মিথ চ্যালেঞ্জ করার মতো একাধিক বৃহত্তর শক্তি তখনো পুঞ্জীভূত হয়নি; কিন্তু বর্তমান সময়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে অনেকের কাছে মনে হতে পারে, ‘পরাশক্তি’ মনে করার বিষয়টি একটি ‘মিথ’। সেই মিথ কি এখন ভেঙে পড়তে যাচ্ছে?

১৪ দফা প্রস্তাব: ক্ষমতার সীমারেখা পুনর্নির্ধারণ

আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক লক্ষণীয়। ১৪ দফা শান্তি প্রস্তাবে যে শর্তাবলি উত্থাপিত হয়েছে—সেনা প্রত্যাহার, অবরোধ প্রত্যাহার, শত্রুতামূলক কার্যক্রমের অবসান—এটি কেবল একটি যুদ্ধের সমাপ্তির আহ্বান নয়—এটি ক্ষমতার সীমারেখা পুনর্নির্ধারণের প্রচেষ্টাও বটে। এখানে বলা হচ্ছে, বলপ্রয়োগের একচ্ছত্র অধিকার আর কারও একক সম্পত্তি নয়। অর্থাৎ, শক্তির ভারসাম্য এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত সব পক্ষের জন্যই ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত।

বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তন

বিশ্বব্যবস্থার এই পরিবর্তন অন্যত্রও প্রতিফলিত হচ্ছে। এমনকি উত্তর আটলান্টিকের যে সামরিক জোটকে একসময় অপ্রতিরোধ্য বলে বিবেচনা করা হতো, তার মধ্যেও এখন প্রশ্ন, সংশয়, ভাঙন, দ্বিধা ও সীমাবদ্ধতা দৃশ্যমান হচ্ছে। অতএব, বর্তমান সংঘাত কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়—এটি এক পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতি রূপান্তরেরও সূচক বটে। এটি দেখাচ্ছে, ‘অপরাজেয়' ও ‘পরাশক্তি' মনে করার বিষয়টি আসলে একধরনের মিথ– যা পরিবর্তিত বাস্তবতার মুখে ভেঙে পড়ে।

ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্বের সম্ভাবনা

যদি এই উপলব্ধিকে যথাযথভাবে অনুধাবন করা যায়, তাহলে হয়তো বিশ্ব আরো ভারসাম্যপূর্ণ, আরো সংলাপনির্ভর একটি পর্যায়ে উপনীত হতে পারে। অন্যথায়, পুরাতন মিথ আঁকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা কেবল সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করবে। এই সমগ্র প্রেক্ষাপট আমাদের এক গভীর সত্যের সম্মুখীন করছে—বিশ্বে কোনো শক্তিই চিরস্থায়ীভাবে একক আধিপত্য বজায় রাখতে পারে না। শক্তির প্রকৃতি পরিবর্তনশীল এবং প্রতিটি আধিপত্যের মধ্যেই নিহিত থাকে তার সীমাবদ্ধতার বীজ।