বাংলাদেশ-নেদারল্যান্ডস সম্পর্কের পাঁচ দশক: নতুন মোড়ে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা
বাংলাদেশ-নেদারল্যান্ডস: পাঁচ দশকে বাণিজ্য-নিরাপত্তায় নতুন মোড়

বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের কূটনৈতিক সম্পর্ক পাঁচ দশক পেরিয়েছে। ঐতিহ্যগত উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে এই সম্পর্ক এখন বাণিজ্য ও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক রূপ নিয়েছে। নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত জরিস ভ্যান বোমেল প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই পরিবর্তনশীল সম্পর্কের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন।

অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত

রাষ্ট্রদূত বলেন, গত কয়েক বছরে দুই দেশের মধ্যে যৌথ রাজনৈতিক পর্যায়ে কাজ বেড়েছে এবং সহযোগিতা আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। পানি ব্যবস্থাপনা ও ডেলটা অঞ্চল নিয়ে কাজ করার কারণে তারা একে অপরের কাছ থেকে শিখতে পারেন। অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার লক্ষ্যে তারা উন্নয়নমুখী বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তুলতে চান, যা অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে হবে। পানি, কৃষি, তৈরি পোশাক শিল্প ও সামুদ্রিক খাতে ব্যবসা সৃষ্টি ও কর্মসংস্থানের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

অরেঞ্জ কর্নারস: তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ফ্ল্যাগশিপ উদ্যোগ

বাংলাদেশে অরেঞ্জ কর্নারস কর্মসূচি তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এটি ওয়াই ওয়াই ভেঞ্চার্স, সাজেদা ফাউন্ডেশন ও ইউনিলিভার বাংলাদেশের যৌথ প্রচেষ্টায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। এতে ইনকিউবেশন সুযোগ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যেখানে প্রায় ৫০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী নারী। অরেঞ্জ কর্নারস ইনোভেশন ফান্ডের মাধ্যমে ইনকিউবেশন পর্যায়ে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার ইউরো এবং পরবর্তী পর্যায়ে ৫০ হাজার ইউরো পর্যন্ত অর্থায়ন দেওয়া হয়। বর্তমানে ৮০টির বেশি উদ্যোগ রয়েছে এবং ২০২৬-২০২৮ সাল পর্যন্ত এই কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নৌ প্রতিরক্ষা ও সামরিক সহযোগিতা

সম্প্রতি দুই দেশ নৌ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সহযোগিতা নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। এতে দক্ষতা ও তথ্য বিনিময়, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত। রাষ্ট্রদূত জানান, নেদারল্যান্ডসের প্রতিষ্ঠান যেমন বোস্কালিস, ফন উর্ড, রয়্যাল আইএইচসি, ড্যামেন ও থালেস ইতিমধ্যে এ খাতে কাজ করছে। ভবিষ্যতে বিমানবাহিনী ও সেনাবাহিনীতেও সহযোগিতা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশ পিস সাপোর্ট অপারেশনস ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষণ ও শান্তিরক্ষা গোয়েন্দা সক্ষমতা উন্নয়নে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

পানি ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু সহনশীলতা

বাংলাদেশ ডেলটা প্ল্যান ২১০০-এর বাস্তবায়নে নেদারল্যান্ডস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কল্যাণপুর খাল প্রকল্প ও সাতক্ষীরা অঞ্চলের প্রকল্পের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে পানি ব্যবস্থাপনা ও উপকূলীয় সুরক্ষায় কাজ চলছে। ড্রেজিং, পলি ব্যবস্থাপনা, নগর পানি সরবরাহ ও বন্যা প্রতিরোধে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে। গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের মাধ্যমে অর্থায়ন ও প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

এলডিসি উত্তরণ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা

বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণকে স্বাগত জানিয়ে নেদারল্যান্ডস টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে সহযোগিতা চায়। পানি ব্যবস্থাপনা, সামুদ্রিক খাত, তৈরি পোশাক শিল্প ও টেকসই কৃষিতে অংশীদারত্বের সম্ভাবনা রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশের ‘সফট ল্যান্ডিং’ নিশ্চিতে শ্রম অধিকার, ব্যবসার পরিবেশ ও পরিবেশগত মানদণ্ডে সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করে নেদারল্যান্ডস।

রোহিঙ্গা সংকট ও আন্তর্জাতিক ফোরামে সহযোগিতা

রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসা করে রাষ্ট্রদূত বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত সহায়তা অব্যাহত রাখা। নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে কাজ করা জরুরি। ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক ফোরামে একসঙ্গে কাজ করার ওপর জোর দেন তিনি।

ভবিষ্যৎ সম্পর্কের মূল ক্ষেত্র

রাষ্ট্রদূতের মতে, ভবিষ্যতে পানি ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি, তৈরি পোশাক শিল্প ও সামুদ্রিক খাতে সহযোগিতা আরও জোরদার হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক মজবুত করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।