ভারত-রাশিয়ার ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তি ‘রেলোস’ কার্যকর
ভারত-রাশিয়ার ‘রেলোস’ প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর

ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে সম্পাদিত এক ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তি ‘রেলোস’ (আরইএলওএস) আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে। এই চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশ এখন থেকে একে অপরের ভূখণ্ডে সেনা, যুদ্ধজাহাজ এবং সামরিক উড়োজাহাজ মোতায়েন করতে পারবে। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম দুই সামরিক শক্তির মধ্যে এই দ্বিপক্ষীয় চুক্তি কেবল প্রতিরক্ষা খাতের গভীরতাকে বাড়াবে না, বরং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করবে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের জটিল সম্পর্কের সমান্তরালে রাশিয়ার সঙ্গে এই সামরিক ঘনিষ্ঠতা নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

কী এই ‘রেলোস’ চুক্তি?

গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে মস্কোতে স্বাক্ষরিত এবং ডিসেম্বর মাসে রাশিয়ার পার্লামেন্টে অনুমোদিত ‘রিসিপ্রোকাল এক্সচেঞ্জ অব লজিস্টিকস সাপোর্ট’ (আরইএলও) বা রেলোস চুক্তিটি গত ১২ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে। এই চুক্তির আওতায়:

  • উভয় দেশ একে অপরের সামরিক ঘাঁটি, নৌবন্দর এবং আকাশপথ ব্যবহার করতে পারবে।
  • শান্তি ও যুদ্ধ উভয় পরিস্থিতির জন্য এই সুবিধা প্রযোজ্য।
  • চুক্তি অনুযায়ী, উভয় দেশ সর্বোচ্চ ৩ হাজার সেনা, ৫টি যুদ্ধজাহাজ এবং ১০টি সামরিক উড়োজাহাজ একে অপরের ভূখণ্ডে মোতায়েন রাখতে পারবে।
  • পাঁচ বছর মেয়াদি এই চুক্তির মেয়াদ পারস্পরিক সম্মতিতে নবায়নযোগ্য।

এই চুক্তির মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ, মেরামত ও কারিগরি সহায়তা প্রদানের কাঠামো তৈরি হয়েছে। এর ফলে রাশিয়ার তৈরি সামরিক সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণ ভারতের জন্য সহজ হবে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাশিয়ার জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

শীতল যুদ্ধের সময় থেকেই ভারত রাশিয়ার অন্যতম প্রধান সামরিক মিত্র। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে ভারত রাশিয়ার সস্তা অপরিশোধিত তেল কেনার ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের রোষানলে পড়েছিল। বর্তমান চুক্তিটি মস্কোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মস্কোর রাশিয়ান ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলের অ্যাকাডেমিক ডিরেক্টর আন্দ্রে করতুনভ বলেন, “এই চুক্তি দুই পক্ষকে একে অপরের অবকাঠামোতে অবাধ প্রবেশাধিকার দিয়েছে। রাশিয়ার জন্য এটি ভারত মহাসাগরে সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের একটি বড় সুযোগ।”

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক অমিতাভ সিং-এর মতে, “মস্কোর জন্য এটি যুদ্ধের কোনও জোট নয়, বরং একটি ‘নিষেধাজ্ঞা-যুগের মোবিলিটি প্যাক’। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে রাশিয়ার জাহাজের অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী করতে এই চুক্তি তাদের কৌশলগত সক্ষমতা বাড়াবে।”

ভারতের জন্য কীভাবে কৌশলগত সুবিধা?

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত অজয় মালহোত্রার মতে, এই চুক্তি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানির সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসে ‘অপারেশনাল লজিস্টিকস’ বা সামরিক কার্যক্ষমতা বিনিময়ের দিকে এগিয়েছে। তিনি বলেন, “এটি ভারতের জন্য আর্কটিক ও দূর প্রাচ্যের রুশ ঘাঁটিতে প্রবেশের সুযোগ করে দেবে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির বিপরীতে রাশিয়ার সঙ্গে এই চুক্তি ভারতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক প্রবীণ ডোন্থি বলেন, “এটি প্রশান্ত মহাসাগর থেকে আর্কটিক পর্যন্ত ভারতের কৌশলগত প্রবেশাধিকার জোরদার করবে।”

যুক্তরাষ্ট্রের ছায়া ও ‘ভারসাম্যের খেলা’

ভারতের সামরিক ইতিহাসে এটিই প্রথম ঘটনা যেখানে কোনও বিদেশি শক্তিকে নিজেদের মাটিতে সেনা মোতায়েনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের ‘লজিস্টিকস এক্সচেঞ্জ মেমোরেন্ডাম অব অ্যাগ্রিমেন্ট’ (এলইএমওএ) থাকলেও, সেখানে সরাসরি সেনা মোতায়েনের সুযোগ নেই।

ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর নীতি ও বাণিজ্যিক শুল্ক আরোপের মুখে ভারত তার নিজস্ব বহুমুখী কৌশল বজায় রাখার চেষ্টা করছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত অজয় মালহোত্রা বলেন, “ওয়াশিংটন বা মস্কো কারো সঙ্গেই ভারতের সম্পর্ক একে অপরের বিপরীত বা ‘জিরো-সাম গেম’ নয়। এই চুক্তিটি মূলত ভারত তার কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার একটি অংশ।”

সূত্র: আল জাজিরা