ট্রাম্পের ইরান নীতি: চুক্তিভঙ্গের ইতিহাস ও মার্কিন পরাজয়ের মুখ
ট্রাম্পের ইরান নীতি: মার্কিন পরাজয় ও চুক্তিভঙ্গের ইতিহাস

ট্রাম্পের ইরান নীতি: চুক্তিভঙ্গের ইতিহাস ও মার্কিন পরাজয়ের মুখ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন নিজের গায়ে কলঙ্ক না মাখানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু তিনি যতই সেই চেষ্টা করুন না কেন, এখন একটি বিষয় পরিষ্কার—ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র অমর্যাদাকরভাবে হেরেছে। ইরানকে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ করানো নিয়ে তাঁর প্রতিশ্রুতি এখন ফাঁকা বুলিতে পরিণত হয়েছে। কোনো যুদ্ধ শুরু না করা এবং ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হওয়ার বিষয়ে নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাঁর সেই বক্তব্য যেমন মিথ্যা ছিল, এখনকার বক্তব্যও একই রকম মিথ্যা।

বিজয় দাবি ও মিথ্যাচারের রাজনীতি

বিজয় দাবি করার পথ খুঁজতে গিয়ে ট্রাম্প একচোটে নিজেকে জয়ী ঘোষণা করে দিয়েছেন। নিজের মিথ্যাচারের প্রতি বৈশ্বিক সমর্থন পেতে তিনি মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এটা করতে গিয়ে তিনি বিশ্বনেতাদের ওপর আক্রমণ শুরু করেছেন। যেসব বিশ্বনেতা তাঁর এই উন্মাদনাকে সমর্থন করছেন না, তিনি তাঁদের ওপর চড়াও হচ্ছেন। এমনকি এ তালিকায় তাঁর নিজের অনুগত ‘মাগা’ বা ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ কর্মসূচির সমর্থকদের কারও কারও নাম রয়েছে।

ইরানি সভ্যতাকে পুরোপুরি ধ্বংস করার হুমকি দেওয়ার পর ট্রাম্প পোপ লিওকে ‘লুজার’ বা ব্যর্থ বলে আক্রমণ করেছেন। এমনকি নিজেকে যিশুর পুনর্জন্ম বলেও দাবি করেছেন তিনি। বিভ্রান্ত ট্রাম্পের এই হীন কর্মকাণ্ডের কি কোনো শেষ নেই?

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তোষামোদকারী ও একনায়কতান্ত্রিক শৈলী

এর চেয়েও খারাপ বিষয় হলো, ট্রাম্পের তোষামোদকারী অধীনরা তাঁর ক্ষমতার লোভকে বাড়িয়ে দিচ্ছেন। তাঁরা তাঁর একনায়কতান্ত্রিক শৈলীকে অনুকরণ করছেন। পাকিস্তানে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ২১ ঘণ্টা আলোচনার পর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মানতে ইরানের ‘ব্যর্থতা’ নিয়ে নিন্দা জানিয়েছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভিয়েতনাম যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তির লক্ষ্যে বিখ্যাত মার্কিন কূটনীতিক হেনরি কিসিঞ্জার ও ভিয়েতনাম কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য লে ডাক থোর প্যারিসে ১৯৭৩ সালে একটি শান্তিচুক্তি করতে চার বছর আট মাস সময় লেগেছিল। সেখানে ভ্যান্স এক দিনের কম সময় আলোচনা করে পাকিস্তান ত্যাগ করেন।

অপকূটনীতি ও অবাস্তব চাহিদা

ভ্যান্স এমনভাবে কথা বলছিলেন, যেন তিনি কোনো রিয়েল এস্টেট বা আবাসন প্রকল্পের চুক্তি করছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এটিই ছিল তাঁর ‘সেরা ও শেষ প্রস্তাব’। তাঁর আচরণ দেখে মনে হয়েছে, তিনি আলোচনার জন্য ইসলামাবাদে যাননি; বরং আত্মসমর্পণের শর্ত চাপিয়ে দিতে গিয়েছিলেন।

ট্রাম্প ও ভ্যান্সের কাছে প্রকৃত আলোচনার কোনো স্থান নেই। তাঁরা ইসরায়েলের শর্তানুযায়ী একটি তাৎক্ষণিক শান্তিচুক্তি চান। প্রথম বৈঠকের পর থেকে ইরান বলে আসছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিশ্বাস অর্জন করতে পারেনি। তাই তাদের বর্তমান অবস্থান যথার্থ।

যুক্তরাষ্ট্রের অসততা ও অতর্কিত হামলা

শান্তিপূর্ণ সমাধানের আলোচনার মাঝপথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দুবার ইরানে অতর্কিত হামলা চালিয়েছে। তারা ইরানের নেতৃত্বকে হত্যা করেছে। হাসপাতাল, স্কুল ও বেসামরিক মানুষের আবাসন ধ্বংস করেছে। এসব কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অসততা নিয়ে ইরান সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসন শত শত ঘণ্টা আলোচনা শেষে ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) বা পারমাণবিক চুক্তি করেছিল। কিন্তু ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে কংগ্রেসের সঙ্গে পরামর্শ না করে এ চুক্তি একতরফাভাবে বাতিল করে দেন এবং ইরানের ওপর আবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।

চুক্তিভঙ্গের কলঙ্কিত ইতিহাস

যুক্তরাষ্ট্রের আদিবাসী বা নেটিভ আমেরিকানদের সঙ্গে দেশটির সরকার ৫০০টির বেশি চুক্তি করেছিল। এর মধ্যে একটিও যথাযথভাবে রক্ষা করা হয়েছে, এমন নজির খুঁজে পাওয়া কঠিন। ইতিহাসবিদেরা এই জঘন্য রেকর্ডকে ‘চুক্তিভঙ্গের কলঙ্কিত অধ্যায়’ বলে অভিহিত করেছেন।

ইরান এখন সেসব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে। ইরানের কয়েক শ কোটি ডলার অর্থ বর্তমানে জব্দ করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এসব অর্থ ছাড় দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এখনো সেই সম্পদ আটকে রেখেছে।

একনায়কসুলভ আচরণ ও যুদ্ধের ঝুঁকি

ট্রাম্পের একনায়কসুলভ আচরণই বর্তমান সংকটের মূল কারণ। ঘনিষ্ঠ তোষামোদকারীদের বাইরে আর কারও সঙ্গে পরামর্শ না করে মাত্র ২১ ঘণ্টার আলোচনার পর হরমুজ প্রণালি অবরোধের নির্দেশ দেন তিনি। এ ধরনের পদক্ষেপকে সাধারণত যুদ্ধ ঘোষণার শামিল হিসেবে ধরা হয়।

ইসলামাবাদে ভ্যান্সের অবস্থানের অবাস্তব ও অপক্ব চরিত্রটি মাত্র একটি তুলনার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা যায়। ভিয়েতনাম যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তির লক্ষ্যে বিখ্যাত মার্কিন কূটনীতিক হেনরি কিসিঞ্জার ও ভিয়েতনাম কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য লে ডাক থোর প্যারিসে ১৯৭৩ সালে একটি শান্তিচুক্তি করতে চার বছর আট মাস সময় লেগেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা সংকট

সেখানে ভ্যান্স এক দিনের কম সময় আলোচনা করে পাকিস্তান ত্যাগ করেন। তিনি ইরানকে এই বলে সতর্ক করেন, তারা যেন যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে ‘খেলা’ না করে। যুক্তরাষ্ট্রের নিজের ইচ্ছায় চাপিয়ে দেওয়া এই যুদ্ধের ভয়াবহতাকে তিনি যেন স্রেফ একটি ভিডিও গেমের সঙ্গে তুলনা করলেন।

দুঃখজনক বিষয় হলো, ইরান ওয়াশিংটনের কোনো প্রতিশ্রুতি কেন বিশ্বাস করতে পারছে না, তা যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করেছে, তাদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়। উত্তর কোরিয়া ও ভিয়েতনাম—এ দুই দেশের সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পরপর যুক্তরাষ্ট্র তা লঙ্ঘন করেছিল।

ক্ষতিপূরণ ও প্রতিশ্রুতির মিথ্যা

সংক্ষেপে বলতে গেলে, প্রেসিডেন্ট পদে যে–ই থাকুক না কেন, যুক্তরাষ্ট্রকে কখনো বিশ্বাসযোগ্য দেশ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। ডেমোক্র্যাট হোক বা রিপাবলিকান, যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টরা আসেন আর যান। কিন্তু দেশটির অসততা ও প্রতারণা অপরিবর্তিত থাকে।

ইরানের দাবিগুলোর অন্যতম হলো দেশটি ধ্বংস করার অপরাধে যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এ প্রসঙ্গে ১৯৭৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রী ফাম ভ্যান ডংয়ের কাছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের পাঠানো একটি চিঠির কথা উল্লেখ করা যায়। সেখানে নিক্সন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭৩ সালের ২৭ জানুয়ারি স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী ‘উত্তর ভিয়েতনামের যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনে’ অংশ নেবে।

আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন ও ভবিষ্যৎ আশঙ্কা

নিক্সনের অনুমান অনুযায়ী, ক্ষতিপূরণ বাবদ অনুদান আকারে পাঁচ বছরে ৩ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা) দেওয়া হবে। ভিয়েতনামের কর্মকর্তারা নিক্সনের কথার ওপর ভরসা করেছিলেন এবং ওই বিলিয়ন ডলার হিসাবে ধরেই নিজেদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন। তবে এজেন্ট অরেঞ্জ, বি-৫২ বোমারু বিমান ও ৫ লাখ মার্কিন সেনার তাণ্ডবে বিধ্বস্ত সেই দেশটিকে একটি পয়সাও পরে আর দেওয়া হয়নি।

এখন এ সম্ভাবনাই বেশি যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আবারও ইরানিদের হত্যা করবে এবং দেশটিকে ধ্বংস করবে। এই দানবগুলো একটি শান্তিচুক্তিতে সম্মত হয়ে এমন একটি সংঘাতের অবসান ঘটাবে, যা ইরান কখনো চায়নি—এমন সম্ভাবনা খুবই কম।

উপসংহার: অন্ধকার ভবিষ্যতের ইঙ্গিত

সুস্থ বুদ্ধির জয় হবে কি না, তা এখন একটি বড় প্রশ্ন। শয়তানতুল্য ট্রাম্প আর ‘সাতানিয়াহু’-ই (ব্যঙ্গ করে নেতানিয়াহুর নাম উচ্চারণ) কেবল মানবতার ওপর কালো ছায়া ফেলছেন না; বরং যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক রেকর্ডও সামনের দিনগুলোতে ভয়াবহ পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন এ আশঙ্কাই বেশি যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আবারও ইরানিদের হত্যা করবে এবং দেশটিকে ধ্বংস করবে। এই দানবগুলো একটি শান্তিচুক্তিতে সম্মত হয়ে এই সংঘাতের অবসান ঘটাবে—এমন সম্ভাবনা খুবই কম।