তৃণমূল কংগ্রেসের পনেরো বছরের শাসনকালে প্রথমবারের মতো এক ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। দলটির প্রধান ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত মুসলিম সম্প্রদায়ের একাধিক প্রভাবশালী নেতা ও বিধায়ক এখন দল থেকে দূরত্ব বজায় রাখছেন বা প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করে বিরোধী শিবিরে যোগ দিচ্ছেন। এই নীরব অসন্তোষ ধীরে ধীরে প্রকাশ্য রূপ নিচ্ছে, যা রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
ফিরহাদ হাকিমের পদক্ষেপ
এই সংকটের সবচেয়ে বড় ঘটনা হলো তৃণমূলের শীর্ষ নেতা ও মমতার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ফিরহাদ হাকিমের অবস্থান পরিবর্তন। গত ৮ জুন তিনি বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত ব্যানার্জির কার্যালয়ে প্রায় ৭০ মিনিটের একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। সম্প্রতি কলকাতার মেয়র পদ থেকে পদত্যাগের পর এই বৈঠক দলবদলের জল্পনাকে তীব্র করেছে। ঋতব্রত ব্যানার্জির ঘনিষ্ঠ সূত্র দাবি করছে, ফিরহাদ হাকিমের আনুষ্ঠানিকভাবে বিরোধী জোটে যোগ দেওয়া এখন সময়ের ব্যাপার।
মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রভাব
ফিরহাদ হাকিম তৃণমূলে মুসলিম সম্প্রদায়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মুখ ও রক্ষক হিসেবে বিবেচিত হতেন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর তার এই পদক্ষেপ দলের জন্য বড় মনস্তাত্ত্বিক ধাক্কা। তবে তিনি একা নন। মুর্শিদাবাদ, মালদহ ও বীরভূমের মতো মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলের আরও অনেক নেতা মমতার পাশ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন হরিহরপাড়ার নিয়ামত শেখ, সমসেরগঞ্জের মোহাম্মদ নূর আলম, সুজাপুরের সাবেক মন্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন, রঘুনাথগঞ্জের আখরুজ্জামান, মোথাবাড়ির গুলশান মালিক ও কাসবার জাভেদ খান। লোকসভায়ও জঙ্গিপুরের খলিলুর রহমান, গয়েশপুরের ইউসুফ পাঠান, মুর্শিদাবাদের আবু তাহের ও ফুলবাড়িয়ার সাজেদা আহমেদের মতো মুসলিম সাংসদরা বিদ্রোহী অবস্থানে আছেন।
বিজেপির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলাচ্ছে?
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল যে মুসলিম ভোটার বা নেতারা কখনো বিজেপির দিকে যাবেন না। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সেই ধারণা ভাঙছে। এখন মুসলিম নেতারাই এনডিএ বা বিজেপি-সমর্থিত মঞ্চের সাথে যোগাযোগ করছেন। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি কোনো মুসলিম প্রার্থী দেয়নি, কিন্তু এই পরিবর্তন ভবিষ্যতে বিজেপির কৌশলেও বদল আনতে পারে।
ক্ষোভের মূল কারণ
তৃণমূলে এই বিদ্রোহ শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং সংখ্যালঘু উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান ও কমিশনগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভের ফল। সঠিক প্রতিনিধিত্ব, সুশাসন ও উন্নয়নের সুষম বণ্টন না পাওয়ায় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। এই সরে যাওয়াকে আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। এক দশকের বেশি সময় ধরে তৃণমূলের ক্ষমতার ভিত্তি ছিল সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক। এখন প্রশ্ন হলো, এটি সাময়িক অসন্তোষ নাকি দীর্ঘস্থায়ী মেরুকরণের সূচনা?



