ইরান-মার্কিন সংঘাত: কুয়েত-বাহরাইনে হামলা, উত্তপ্ত উপসাগর
ইরান-মার্কিন সংঘাত: কুয়েত-বাহরাইনে হামলা, উপসাগর উত্তপ্ত

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রায় ১০০ দিন ধরে চলা যুদ্ধের অবসান নিয়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা যখন অচলাবস্থায়, তখন আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে উপসাগরীয় অঞ্চল। বুধবার ভোরে কুয়েত ও বাহরাইনে ক্ষেপাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় ইরান। এর আগে ইরানের কেশম দ্বীপে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। নতুন এই সংঘাত পরিস্থিতি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ আবার শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সংঘাত শুরু

গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে উপসাগরের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে একাধিকবার হামলা চালিয়েছে ইরান। তবে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৮ এপ্রিল কার্যকর হওয়া সাময়িক যুদ্ধবিরতির পর সংঘাত অনেকটাই কমে এসেছিল। বুধবারের ঘটনা সেই পরিস্থিতিকে আবারও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

কুয়েত ও বাহরাইনে কী ঘটেছে

কুয়েতের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা কুনা জানিয়েছে, বুধবার সকালে ইরানের ছোড়া ক্ষেপাস্ত্র ও ড্রোন দেশটির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আঘাত হানে। এতে কয়েকজন আহত হন। বিমানবন্দরের বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফ্লাইট চলাচল স্থগিত ও অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বুধবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তারা জানায়, হামলায় একজন ভারতীয় নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং আরও কয়েকজন ভারতীয় আহত হয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নিহত ব্যক্তির পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হচ্ছে। আহতদের সহায়তায় ভারতীয় দূতাবাস প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ভিন্ন দাবি করেছে। তাদের ভাষ্য, কুয়েতের দিকে ছোড়া দুটি ইরানি ক্ষেপাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই মাঝপথে ব্যর্থ হয়। আরও কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপাস্ত্রও নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারেনি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অন্যদিকে ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) একটি উপসাগরীয় দেশে অবস্থানরত মার্কিন হেলিকপ্টার লক্ষ্য করে ক্ষেপাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। ধারণা করা হচ্ছে, এতে কুয়েতের কথাই বোঝানো হয়েছে। তবে ওই মার্কিন হেলিকপ্টারগুলো কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ছিল কি না, কিংবা প্রতিহত করা ক্ষেপাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ দুর্ঘটনাক্রমে বিমানবন্দরে পড়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।

তাসনিম আরও জানিয়েছে, বাহরাইনে অবস্থিত একটি বিমানঘাঁটি এবং মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দফতর লক্ষ্য করেও ক্ষেপাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়ে আইআরজিসি। হামলার সতর্কতা হিসেবে দেশটিতে সাইরেনও বাজানো হয়। তবে সেন্টকমের দাবি, বাহরাইনমুখী সব ক্ষেপাস্ত্র আকাশেই প্রতিহত করা হয়েছে। কুয়েত ও বাহরাইনের হামলায় কোনও মার্কিন সেনা বা সামরিক সম্পদের ক্ষতি হয়নি বলেও জানিয়েছে তারা।

ইরানেও কি হামলা হয়েছে?

কুয়েত ও বাহরাইনে হামলার ঠিক আগে ইরানের কেশম দ্বীপে একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে আঘাত হানে মার্কিন বাহিনী। উপসাগরে অবস্থিত এই দ্বীপটিকে ইরানের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপাস্ত্র সংরক্ষণাগারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে মনে করা হয়। সেন্টকম জানিয়েছে, আঞ্চলিক জলসীমায় বেসামরিক জাহাজ লক্ষ্য করে ছোড়া কয়েকটি ইরানি ড্রোনও ভূপাতিত করা হয়েছে।

এদিকে তেহরানের দাবি, হরমুজ প্রণালির কাছে একটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এতে জাহাজটির ইঞ্জিন কক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, এর জবাবে আইআরজিসির নৌবাহিনী ‘পানায়া’ নামের একটি জাহাজকে ক্ষেপাস্ত্র দিয়ে লক্ষ্যবস্তু করেছে।

প্রথম আঘাত কে হেনেছে?

এই প্রশ্নে ওয়াশিংটন ও তেহরানের বক্তব্য ভিন্ন। তবে ট্রাম্প প্রশাসন আগেই স্পষ্ট করেছে যে, ইরানের বন্দর ও জাহাজ অবরোধ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানি তেল পরিবহনও চলতে দেবে না। ঘটনাপ্রবাহ থেকে যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তাতে বুধবার সকালের উত্তেজনা শুরু হয় ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে মার্কিন হামলার মধ্য দিয়ে। এরপর উভয় পক্ষই একমত যে, ইরান উপসাগরের অন্যান্য জাহাজে হামলার চেষ্টা চালায়। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তারা ওই ড্রোনগুলো ভূপাতিত করার পর কেশম দ্বীপে হামলা চালায়। এর জবাবে কুয়েত ও বাহরাইনের দিকে ক্ষেপাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়ে ইরান।

নতুন পরিস্থিতি নিয়ে কী বলছে ইরান

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেশম দ্বীপে মার্কিন হামলাকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, কুয়েত ও বাহরাইন এই হামলার জন্য ‘সরাসরি ও স্পষ্টভাবে দায়ী’। কারণ, তাদের ভূখণ্ড ও স্থাপনা ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ইরান জানিয়েছে, আত্মরক্ষার অধিকার তারা সংরক্ষণ করে এবং ভবিষ্যতে যেকোনো হামলার উৎসকে লক্ষ্য করে প্রয়োজনীয় সব ধরনের জবাব দেওয়ার অধিকার রাখে। আইআরজিসির উদ্ধৃতি দিয়ে ইরানি গণমাধ্যম বলেছে, ‘হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে এর জন্য চড়া মূল্য দিতে হবে।’

আলোচনা ও কূটনীতি কোন পথে?

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মঙ্গলবার কংগ্রেসের শুনানিতে আইনপ্রণেতাদের বলেছেন, ইরান পারমাণবিক কার্যক্রম ত্যাগে রাজি হলেই কেবল নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে রাজি হবে ওয়াশিংটন। এ সময় তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ শেষ হয়েছে।’ তবে নিউ জার্সির ডেমোক্র্যাট সিনেটর করি বুকার তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। এ সময় রুবিও আরও জানান, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি জীবিত আছেন এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় ক্রমেই বেশি সম্পৃক্ত হচ্ছেন। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তার পূর্বসূরি ও পিতা আলী খামেনি নিহত হয়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছিল, আর সেই হামলায় মোজতবা খামেনি আহত হন বলেও দাবি করা হয়েছিল।

অন্যদিকে তেহরান চায় তাদের তেল বিক্রির বিপুল রাজস্বে প্রবেশাধিকার, অপরিশোধিত তেল রফতানিতে ছাড়, বন্দর অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালির ওপর প্রভাব বজায় রাখতে। ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ লেবাননের পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরির সঙ্গে এক আলাপে বলেন, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকলে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা পরিত্যাগ করে সরাসরি সংঘাতের পথে যেতে পারে।

কবে থেকে সাম্প্রতি উত্তেজনার সূত্রপাত

যুদ্ধবিরতির পর কয়েক সপ্তাহ তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতি থাকলেও সম্প্রতি আবার হামলা-পাল্টা হামলা বেড়েছে। রবিবার রাতে সেন্টকম জানায়, তারা ‘আত্মরক্ষামূলক হামলা’ চালিয়ে গোরুক শহর এবং কেশম দ্বীপে অবস্থিত ইরানি রাডার ও ড্রোন স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করেছে। এর এক দিন পর কুয়েতের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ জানায়, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শত্রুপক্ষের ক্ষেপাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করছে। বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেলে তা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বাধা দেওয়ার ফল বলে জানানো হয়। এরও আগে, ১৭ মে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি কর্তৃপক্ষ জানায়, আল-ধাফরা অঞ্চলে অবস্থিত বারাকাহ বিদ্যুৎকেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাইরে একটি বৈদ্যুতিক জেনারেটরে ড্রোন হামলার কারণে আগুন লাগে। তবে এতে কেউ আহত হয়নি এবং বিকিরণের মাত্রাও স্বাভাবিক ছিল।

প্রায় ১০০ দিন ধরে চলা যুদ্ধের মধ্যে নতুন এই সংঘাত দেখাচ্ছে, যুদ্ধবিরতি এখনও ভঙ্গুর। কূটনৈতিক আলোচনায় অগ্রগতি না হলে উপসাগরীয় অঞ্চলে আবারও বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

সূত্র: আল জাজিরা